করতালি দিয়ে কি শিল্পীর ঋণ শোধ হয় । শাখাওয়াৎ নয়ন
আমরা যারা বড় শহরে অভিবাসী, তারা বোধ হয় একটু বেশিই ভাগ্যবান। আমি সিডনিতে থাকি। নিউইয়র্ক, লন্ডন, টরন্টো কিংবা মেলবোর্নে থাকা বাঙালিদের ক্ষেত্রেও কথাটি প্রযোজ্য। দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও আমাদের ‘দেশ’ খুব বেশি দূরে থাকে না। কখনো গান হয়ে আসে, কখনো সিনেমা, কখনো বইমেলা; কখনো পূজার ঢাক, কখনো ঈদের কোলাকুলি, কখনো একুশের প্রভাতফেরিতে।
সিডনিতে এখন প্রায় প্রতি সপ্তাহেই কোনো না কোনো বাঙালি আয়োজন। বাংলাদেশ কিংবা কলকাতা থেকে গায়ক-গায়িকা, অভিনেতা-অভিনেত্রী আসছেন। সিনেপ্লেক্সে বাংলা সিনেমা চলছে। বৈশাখে মেলা বসে, দুর্গাপূজায় ঢাক বাজে, ঈদে মিলনমেলা হয়। একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসে মানুষ জড়ো হয়। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে বসেও আমরা ভাষা, স্মৃতি আর সংস্কৃতির সুতো ধরে পুরোনো ভূগোলটির সঙ্গে যুক্ত থাকি।
কিন্তু এই যে প্রবাসে এত সহজে ‘বাংলাদেশ’ পাওয়া যায়, এটি মোটেও সহজে তৈরি হয়নি। এর পেছনে আছে অসংখ্য মানুষের বছরের পর বছর নিঃশব্দ শ্রম। কেউ গান শিখিয়েছেন, কেউ নাচ। কেউ নাটকের রিহার্সেল করেছেন, করিয়েছেন রাতের পর রাত। কেউ অনুষ্ঠান আয়োজন করতে গিয়ে নিজের কাজ, পরিবার ও অবসর থেকে সময় কেটেছেন। কেউ স্পনসরের দরজায় দরজায় ঘুরেছেন, কেউ পোস্টার বানিয়েছেন, কেউ চেয়ার সাজিয়েছেন। তাঁদের অনেকের নাম আমরা জানি না। জানার প্রয়োজনও বোধ করি না। অনুষ্ঠান শেষে আলো নিভে গেলে তাঁরাও যেন অন্ধকারে মিলিয়ে যান।
অথচ তাঁদের শ্রমের ওপর দাঁড়িয়েই আজকের এই জমজমাট সাংস্কৃতিক সিডনি। একসময় বাংলাদেশ থেকে নামকরা শিল্পী এলেই মূলত হলভর্তি দর্শক দেখা যেত। এখন দৃশ্যপট বদলেছে। সিডনির স্থানীয় বাঙালি শিল্পীদের গান, নাটক ও সাংস্কৃতিক আয়োজনেও ২০০, ৩০০ এমনকি ৫০০ আসনের অডিটরিয়াম পূর্ণ হয়ে যায়। মঞ্চনাটকে দর্শক হচ্ছে, স্থানীয় শিল্পীদের অনুষ্ঠান দেখতে মানুষ টিকিট কিনছেন। অর্থাৎ প্রবাসের বাংলা সংস্কৃতি এখন আর কেবল ‘দেশ থেকে শিল্পী আসবেন, আমরা অনুষ্ঠান দেখব’ এই নির্ভরতার মধ্যে আটকে নেই। তার নিজের শিল্পী তৈরি হয়েছে, নিজের দর্শক তৈরি হয়েছে, নিজের সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি হয়েছে।
একুশে একাডেমী অস্ট্রেলিয়ার কথাই ধরা যাক। ২৭ বছর ধরে তারা বইমেলা আয়োজন করে চলেছে। বাংলাদেশের বাইরে খোলা মাঠে সর্ববৃহৎ বাংলা বইমেলা আয়োজন, বিদেশের মাটিতে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ, বিশাল প্রভাতফেরি; এসবের পেছনে কত মানুষের কত ঘণ্টার শ্রম জমা আছে, তার হিসাব কি আমরা কখনো করেছি?
সম্ভবত করিনি। আর এখানেই আমার একটু আপত্তি, একটু অস্বস্তি এবং একটি প্রশ্ন।
বাংলাদেশ থেকে একজন জনপ্রিয় শিল্পী আসবেন। তাঁকে আমরা বিমানভাড়া দেব, থাকার ব্যবস্থা করব, যাতায়াতের ব্যবস্থা করব, সম্মানী দেব। খুবই ভালো কথা। একজন শিল্পী তাঁর কাজের উপযুক্ত পারিশ্রমিক পাবেন; এটাই সভ্য সমাজের নিয়ম। বরং সামর্থ্য থাকলে তাঁকে আরও ভালো সম্মানী দেওয়া উচিত।
কিন্তু একই মঞ্চে যখন সিডনির একজন শিল্পী গান করেন, নাচেন, আবৃত্তি করেন কিংবা বাদ্যযন্ত্র বাজান; তখন হঠাৎ আমাদের অর্থনীতির সংজ্ঞা বদলে যায় কেন?
তাঁর জন্য থাকে—‘অনেক ধন্যবাদ’।
আর একটু বেশি উদার হলে ‘একটি ফুলের তোড়া, একটি ক্রেস্ট এবং প্রচুর করতালি!’
প্রশ্ন হচ্ছে, করতালি দিয়ে কি শিল্পীর ঋণ শোধ হয়?
সিডনিতে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান শিশু-কিশোরদের গান ও নাচ শেখাচ্ছে। স্থানীয় শিল্পীরা নিয়মিত রিহার্সেল করছেন। নাট্যকর্মীরা মাসের পর মাস প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একজন সংগীতশিল্পী মঞ্চে পাঁচ মিনিট গান করেন; কিন্তু সেই পাঁচ মিনিটের পেছনে হয়তো আছে বিশ বছরের সাধনা। একজন নৃত্যশিল্পীর ছয় মিনিটের পরিবেশনার পেছনে থাকে অসংখ্য ঘণ্টার প্রশিক্ষণ ও মহড়া। একজন অভিনেতার সংলাপের পেছনে থাকে রাতের পর রাত প্রস্তুতি।
এসব শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্য নেই; এ কথা আমরা শিখলাম কোথা থেকে? আরও মজার ব্যাপার হলো, একই মানুষ বাংলাদেশে থাকলে তিনি ‘শিল্পী’; প্লেনে চড়ে সিডনিতে এলে তিনি ‘অতিথি শিল্পী’ এবং সম্মানীর যোগ্য। কিন্তু সিডনিতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলেই তিনি যেন হয়ে যান ‘কমিউনিটির মানুষ’। আর কমিউনিটির মানুষের শ্রম তো ফ্রি!
এই মানসিকতাটি বদলানো দরকার। আমি বলছি না প্রতিটি ছোট অনুষ্ঠানে প্রত্যেক শিল্পীকে বিপুল অঙ্কের টাকা দিতে হবে। সব সংগঠনের সেই সামর্থ্যও নেই। কিন্তু একটি নীতি অন্তত প্রতিষ্ঠিত হতে পারে; শিল্পীর শ্রম বিনামূল্যের নয়। সামর্থ্য অনুযায়ী সম্মানী হোক। ছোট সংগঠন ছোট সম্মানী দিক, বড় আয়োজন বড় সম্মানী দিক। বাজেট করার সময় হলভাড়া, সাউন্ড সিস্টেম, খাবার, প্রচার, অতিথি শিল্পীর বিমানভাড়ার পাশে স্থানীয় শিল্পী ও কলাকুশলীদের জন্যও একটি বাজেট থাকুক।
কারণ বিদেশ থেকে শিল্পী আসবেন, আমাদের আনন্দ দেবেন, তারপর ফিরে যাবেন। কিন্তু পরের শনিবার আপনার সন্তানকে বাংলা গানটি শেখাবেন কে? বৈশাখের অনুষ্ঠানে নাচটি তৈরি করবেন কে? একুশের সকালে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গাইবেন কে? বাংলা নাটকের সংলাপ উচ্চারণ করবেন কে?
তাঁরা আমাদের পাশেই আছেন। প্রবাসে সংস্কৃতি শুধু স্মৃতির বিলাসিতা নয়; এটি পরিচয়ের আশ্রয়। আমাদের সন্তানদের সঙ্গে তাদের পূর্বপুরুষের ভাষা, ইতিহাস ও সংস্কৃতির সেতু। সেই সেতু যাঁরা প্রতিদিন একটু একটু করে নির্মাণ করছেন, তাঁদের শ্রমকে যদি আমরা মূল্যহীন ভাবি, একদিন হয়তো দেখব—মঞ্চ আছে, আলো আছে, চেয়ার আছে, দর্শকও আছে; শুধু শিল্পী এবং শিল্পী তৈরির মানুষগুলো আর নেই।
তাই বাংলাদেশ থেকে শিল্পী আনুন। তাঁদের যথাযোগ্য সম্মান দিন। অনুষ্ঠান করুন, হলভর্তি দর্শক হোক। আমরা প্রাণ খুলে করতালি দেব।
তবে করতালির একটু আগে স্থানীয় শিল্পীর সম্মানীর খামটিও প্রস্তুত রাখুন। কারণ শিল্পী শুধু ভালোবাসায় বাঁচেন—এই কথাটি শুনতে খুব সুন্দর। সত্যি নয়।
লেখকঃ কথাসাহিত্যিক, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক।




