ক‍্যাম্বেলটাউনে তিন প্রাণহানি: শুধু বিষন্নতা নয় । শিল্পী রহমান

ক‍্যাম্বেলটাউনে তিন প্রাণহানি: শুধু বিষন্নতা নয় । শিল্পী রহমান

একজন ৪৭ বছর বয়সের পিতা তার দুই সন্তান ও স্ত্রীকে ছুরিকাঘাতে খুন করে নিজেই পুলিশে ফোন করে ধরা দিয়েছেন। এটা থেকে আমরা কি বুঝতে পারি?

জীবনের কঠিন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে স্ত্রী ও সন্তানদের মুক্তি দিতে চেয়েছিলেন?

বিশেষ চাহিদাপূর্ণ সন্তানদের ভার বইতে পারছিলেন না?

নিজে এই গুরুদায়িত্ব থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন?

পুরুষ হয়ে ঘরসংসারের দায়িত্ব তার মধ্যে কোনো হীনমন্যতার উদ্রেক করেছিল?

জীবনের purpose বা লক্ষ্য হারিয়ে ফেলেছিলেন?

কারণ যেটাই হোক না কেন, তদন্তকারীরা বলছেন, সত্য হলো মোঃ সুমন আহমেদ তার পরিবারের তিনজন কাছের মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড পুরো দেশবাসীকে থমকে দিয়েছে, অনেকের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। কোনোভাবেই নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পারছে না।

খবরে প্রকাশ, কথিত হত্যাকারী সুমন আহমেদ বিষণ্ণতায় ভুগতেন এবং পার্থে ঘটে যাওয়া অনুরূপ একটি মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড তাকে অনুপ্রাণিত করেছে। খবরে আরও জানা যায়, সুমন আহমেদ এ বছরের জানুয়ারি মাস থেকেই তার পরিবারকে হত্যা করার পরিকল্পনা করছিলেন। জানুয়ারি মাসের পর থেকেই তিনি একাকী জীবনযাপন করেছেন, অর্থাৎ বাইরের কারও সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না। স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক কেমন ছিল, সেটা জানা যায়নি। তবে স্পেশাল নিড বা বিশেষ চাহিদাপূর্ণ শিশুদের সংসারে স্ট্রেস, মতবিরোধ, দোষ দেওয়া (ব্লেইম গেইম), অ্যাংজাইটির চাপ থাকা অস্বাভাবিক বিষয় নয়। শুধু দরকার ছিল এই বিষয়গুলো নিয়ে প্রফেশনাল সাহায্য নেওয়া।

বাড়িতে বিশেষ চাহিদাপূর্ণ সন্তান লালন করা অনেক বড় দায়িত্ব। মানুষ একজনকে সামলাতেই হিমশিম খেয়ে যায়, সেখানে এই পরিবারের দুজন অটিস্টিক এবং কথা বলতে অক্ষম সন্তানের দায়িত্ব অত্যন্ত হতাশাজনক ও ক্লান্তিকর হতে পারে।

অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (ASD) হলো একটি আজীবন স্থায়ী স্নায়ুবিক ও মস্তিষ্কের বিকাশজনিত অবস্থা, যা ব্যক্তির যোগাযোগ, আচরণ এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়ায় প্রভাব ফেলে। “স্পেকট্রাম” শব্দটি ব্যবহার করা হয়, কারণ আক্রান্তদের লক্ষণ ও তীব্রতা প্রতিটি ব্যক্তির ক্ষেত্রে ভিন্ন এবং আলাদা হয়। যেসব শিশুদের মধ্যে অটিজম, এডিএইচডি, এডিডি, অ্যাংজাইটি বা অন্য কোনো নিউরোডাইভারজেন্ট লক্ষণ থাকে, তাদের পিতামাতারও এসব লক্ষণ থাকার সম্ভাবনা আছে বলেই মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন। যা হয়তো অনেক পিতামাতা জানেন, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এগুলো অজানা থাকে। এসব পিতামাতা যখন আবার তাদের বিশেষ চাহিদাপূর্ণ সন্তানদের লালন-পালন করতে যান, তখন তাদের জন্য এগুলো আরও অনেক বেশি জটিল এবং কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে। যেমন, একজন অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত বাবা বা মাকে যদি তাদের অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারের সন্তানকে লালন-পালন করতে হয়, তখন তাদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটতে পারে, অথবা অনিয়ন্ত্রিত রাগ, অ্যাংজাইটি বা ডিপ্রেশনও বাড়তে পারে।

ডিপ্রেশনে ভোগা একজন মানুষ কি খুন করতে পারে?

ASD

ইউনিভার্সিটি অফ অক্সফোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ এবং গবেষণার মূল ঐকমত্য থেকে জানা যায়, বিষণ্ণতায় আক্রান্ত বেশিরভাগ মানুষই কখনো কোনো ধরনের অপরাধ বা সহিংসতায় জড়ান না। গবেষণায় এ ধরনের ঝুঁকির তথ্য পাওয়া গেলেও, বিষণ্ণতাকে সরাসরি অপরাধ বা হত্যার কারণ হিসেবে বিবেচনা করা ভুল। বিষণ্ণতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিজেদের ক্ষতি করার বা আত্মহননের ঝুঁকি বেশি থাকে, অন্যের ক্ষতি করার নয়।

বেশিরভাগ ক্লিনিকাল এবং অপরাধমূলক গবেষণা এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে কয়েকটি মূল কারণ বা বৈশিষ্ট্যের ওপর জোর দেয়। বিষণ্ণতার (depression) কারণে সৃষ্ট সহিংস আচরণ বা হত্যার ঝুঁকি মূলত তখনই বৃদ্ধি পায়, যখন এর সঙ্গে অন্যান্য জটিল মানসিক সমস্যা যুক্ত হয়। এটি কেবল বিষণ্ণতার একক প্রভাব নয়।

বিষণ্ণতার সঙ্গে যোগ হওয়া প্রধান শর্ত ও ঝুঁকিগুলো হলো:

• আন্ডারলাইং পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার (ব্যক্তিত্বের ব্যাধি): ইমপালস কন্ট্রোল সমস্যা (impulsive behavior), বিশেষ করে অ্যান্টিসোশ্যাল পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার (Antisocial Personality Disorder) থাকলে সহিংস আচরণের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

• গুরুতর আঘাত বা ট্রমার ইতিহাস (Severe Trauma): শৈশবের পারিবারিক সহিংসতা, অবহেলা বা নির্যাতনের শিকার হওয়া, শারীরিক, মানসিক বা যৌন নির্যাতনের ইতিহাস থাকলে তা পরবর্তীতে বিষণ্ণতার পাশাপাশি অপরাধমূলক আচরণে জড়াতে পারে।

• মাদক ও অ্যালকোহলের অপব্যবহার (Substance Abuse): বিষণ্ণতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে যারা মাদক বা অ্যালকোহলের অপব্যবহার করেন, তাদের সহিংস আচরণের ঝুঁকি অনেক গুণ বেড়ে যায়।

একা বিষণ্ণতার চেয়ে এই জটিলতাগুলোই মূলত অপরাধের কারণ হিসেবে বেশি কাজ করে।

আমরা প্রায়শই বিভিন্ন গ্রুপে অ্যানোনিমাস পোস্ট দেখতে পাই। সেখানে মানুষ আকুল আকুতি নিয়ে নিজেদের জীবনের সমস্যা উল্লেখ করেন এবং মানুষের কাছে বুদ্ধি বা পরামর্শ চান। তারা কজন সেই সমস্যা থেকে মুক্তি পান বা সমস্যার মোকাবিলা করতে পারেন, আমি জানি না। তাদের সবাইকে বলবো প্রফেশনাল সাহায্য নিতে।

এই দুর্ঘটনাগুলো আমাদের শেখায়, জীবনের সমস্যাগুলোকে অগ্রাহ্য করা ভুল সিদ্ধান্ত। “মানিয়ে নেবো” বা “ঠিক হয়ে যাবে”— এই ধারণাগুলো ভুল। মাঝে মাঝে জীবন বড় কঠিন ও জটিল মনে হয়, দায়িত্বের বোঝা অনেক ভারী মনে হয়— আর ঠিক তখনই কাউন্সেলিংয়ে যাওয়ার উপযুক্ত সময়। ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হবে না, এই পরিবারটির মতো সর্বনাশ আমরা কেউ চাই না।

নিচের বিষয়গুলোকে হালকা করে দেখবেন না বা অবহেলা করবেন না:

• দিনের পর দিন আপনার কিছু ভালো লাগছে না, বিষণ্ণতায় ভুগছেন — কাউন্সেলিংয়ের সাহায্য নিন।

• স্বামী/স্ত্রীর দ্বারা নিজেকে অবহেলিত মনে হচ্ছে — থেরাপিতে যান, কথা বলুন কাউন্সেলরের সঙ্গে।

• সন্তানের আচরণ আপনাকে দুঃখ দিচ্ছে — পেডিয়াট্রিশিয়ানকে দেখান, নিজেও থেরাপি নিন।

• অটিস্টিক, এডিএইচডি, এডিডি বা অন্য কোনো নিউরোডাইভারজেন্ট সন্তানকে মানুষ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন — ওদের চিকিৎসার পাশাপাশি নিজেও কাউন্সেলিংয়ে যান। কারণ আপনি অত্যন্ত চাপপূর্ণ ও উদ্বেগজনক কাজ করছেন। নিজের যত্ন না নিলে আপনি ভেঙে পড়তে বাধ্য।

• শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী শিশু বা পরিবারের কারও সেবা করতে হলে নিজের যত্ন নিন, থেরাপিতে যান।

সংসারে অশান্তি, রাগারাগি এবং মারামারিকে অগ্রাহ্য করবেন না। এসব ঘটনাকে সাধারণ বা ছোট মনে হলেও একটা সময় এগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। যেই মুহূর্তে মনে হবে জীবনে শান্তি নেই, বাসায় অত্যাধিক চেঁচামেচি হচ্ছে অথবা কথাই হচ্ছে না, মিথ্যা কিংবা অন্যায্য কিছু হচ্ছে — সঙ্গে সঙ্গে প্রফেশনাল কারও সঙ্গে কথা বলবেন। দেরি করবেন না, তাহলে সমস্যা অনেক দূর গড়াতে পারে।

নিজে নিজেকে কাউন্সেলিং করার আইডিয়াটা ভুল। ওটা আসলে অনুভূতিগুলোকে suppress করা হয়, যা একেবারেই স্বাস্থ্যকর নয়। আপনার শরীর সব কষ্টের হিসাব রাখে। এগুলো আপনাকে শারীরিকভাবেও অসুস্থ করে দিতে পারে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমাতে পারে এবং অন্যান্য উপসর্গ শুরু হতে পারে।

নিজে সিদ্ধান্ত নেবেন না যে, আপনার কাউন্সেলিং লাগবে না। কারণ আপনি এবং আপনার সন্তান অনেক ভালো জীবনযাপনের যোগ্যতা রাখেন। তাই পরিবারের সবার মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা অত্যন্ত জরুরি। আপনি নিজে ভালো থাকলে আপনার আপনজনেরাও ভালো থাকবে।

কি ধরনের সাহায্য পেতে পারেন:

• অস্ট্রেলিয়াতে মেডিকেয়ার থেকে কাউন্সেলিং সেশনের আংশিক খরচ ফেরত দেওয়া হয়। তবে সেই কাউন্সেলিং নিতে হবে যোগ্য প্রফেশনাল, যেমন মনোবিজ্ঞানী (psychologist), ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্কার, কাউন্সেলর এবং অকুপেশনাল থেরাপিস্টের কাছ থেকে। প্রথমে GP-এর কাছ থেকে একটি Mental Health Treatment Plan নিতে হবে, তারপর রেফারেল লেটার নিয়ে আপনি কাউন্সেলিং সেশন নিতে পারবেন। আপনি প্রতিবছরে সর্বোচ্চ ১০টি ব্যক্তিগত এবং ১০টি গ্রুপ থেরাপি সেশনের জন্য মেডিকেয়ার রিবেট দাবি করতে পারেন। মেডিকেয়ার যেহেতু সেশন ফি-এর একটি নির্দিষ্ট অংশ বহন করে, তাই বাকি অংশ, যাকে “gap fee” বলা হয়, আপনাকে নিজ খরচে পরিশোধ করতে হবে।

• এখানে বলে রাখা ভালো, আমাদের বাঙালিদের মধ্যে অনেক কাউন্সেলর আছেন, যারা শুধু সেই “gap fee” দিয়েই আপনার কাউন্সেলিং করে থাকেন। এর মধ্যে অনেকেই স্টুডেন্ট এবং অর্থনৈতিক জটিলতায় ভুক্তভোগীদের ডিসকাউন্ট দিয়েও কাউন্সেলিং করে থাকেন। খোঁজ নিন।

• এনডিআইএস (NDIS) কী ধরনের সহায়তা প্রদান করে:

NDIS থেকে কিছু মনোসামাজিক সহায়তা প্রদান করা হয়, যা আপনার দৈনন্দিন কার্যক্ষমতা, স্বাধীনতা এবং সামাজিক অংশগ্রহণ উন্নত করতে সাহায্য করে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে:

• আপনার প্রতিবন্ধিতার সঙ্গে সম্পর্কিত মানসিক চাপ মোকাবিলা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা গড়ে তোলা।

• প্রতিবন্ধিতার কারণে সৃষ্ট উদ্বেগ, ট্রমা বা সামাজিক সমস্যাগুলো মোকাবিলা করা।

• ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং সামাজিক দক্ষতা উন্নত করা।

• দৈনন্দিন কাজকর্মে প্রভাব ফেলে এমন আচরণ নিয়ন্ত্রণের কৌশল শেখানো।

মানসিক স্বাস্থ্য ও সহায়তা প্রদানকারী সংস্থার হটলাইন নম্বরে যোগাযোগ করে বিনামূল্যে তাৎক্ষণিক জরুরি পরামর্শ গ্রহণ করতে পারেন। যেমন, লাইফলাইন, থার্টিন ইয়ার্ন, কিডস হেল্পলাইন, বিয়ন্ড ব্লু।

সবশেষে বলবো, আপনি যদি নিজের মাঝে বা আপনার পরিচিত কারও মধ্যে এই ধরনের সহিংসতা বা খুনের পরিকল্পনা করার মতো ভয়ংকর লক্ষণ দেখতে পান, তবে অবিলম্বে একজন প্রফেশনাল সাইকিয়াট্রিস্ট অথবা কাউন্সেলরের সাহায্য নিন।

ডিপ্রেশন সম্পূর্ণ একটি চিকিৎসাযোগ্য রোগ। সঠিক থেরাপি এবং ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে এই ধরনের মারাত্মক চিন্তাভাবনা থেকে রোগীকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব।

আমি দুটি অবুঝ শিশু ও তাদের মায়ের অকাল মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করছি এবং তাদের আত্মার শান্তি কামনা করছি।

শিল্পী রহমান : লেখক ও কাউন্সেলর। ব্রিসবেন, অস্ট্রেলিয়া।