মার্ক টালি: বাংলাদেশের বন্ধু । সোহরাব হাসান

মার্ক টালি: বাংলাদেশের বন্ধু । সোহরাব হাসান

বাংলাদেশ, ভারত ও যুক্তরাজ্য—এই তিন দেশে অসামান্য সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন যে সাংবাদিক, তাঁর নাম স্যার উইলিয়াম মার্ক টালি। তিনি নিজ দেশ যুক্তরাজ্যে নাইটহুড উপাধি পেয়েছেন। যে দেশে তাঁর জন্ম ও কর্মজীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে, সেই ভারতে পেয়েছেন পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ। আর বাংলাদেশ তাঁকে একাত্তরের ভূমিকার জন্য দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা।

মার্ক টালি নামটি এ দেশের মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিতি পায় একাত্তরে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে। তিনি তখন ছিলেন বিবিসির দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সংবাদদাতা। তাঁর পাঠানো খবরগুলো বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার খবর যেন বহির্বিশ্ব না জানতে পারে, সে জন্য পাকিস্তান সরকার সব বিদেশি সাংবাদিককে বের করে দেয়। এরপরও সাইমন ড্রিংয়ের প্রতিবেদনের মাধ্যমে সারা বিশ্ব পাকিস্তানিদের অপকর্মের কথা জেনে যায়। সে সময়ে ভারতে অবস্থানরত সাংবাদিকেরা শরণার্থীদের বরাতে পাকিস্তানিদের ধ্বংসযজ্ঞের খবর প্রচার করতে থাকেন।

মার্ক টালির সাথে লন্ডনবাসী সাংবাদিক ও লেখক বুলবুল হাসান। ছবি- বুলবুল হাসান। 

এই পটভূমিতে পাকিস্তান সরকার কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিককে ‘তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে’ পাঠায় সরেজমিনে সবকিছু দেখে যাওয়ার জন্য। মার্ক টালি ছিলেন সেই সাংবাদিক দলের সদস্য। পাকিস্তানিদের উদ্দেশ্য ছিল ‘সবকিছু স্বাভাবিক দেখানো’। কিন্তু পাকিস্তান সরকারের আতিথেয়তা গ্রহণকারী সাংবাদিকেরা নিজ নিজ দেশে গিয়ে যা লিখলেন, তা ইসলামাবাদের জন্য বুমেরাং হলো।

মার্ক টালি সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন—

যখন ঢাকার বাইরে গেলাম, যেমন রাজশাহীর কথা বলতে পারি, দেখলাম যে রাস্তার পাশের প্রায় প্রতিটি গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। স্পষ্টভাবেই এই ভূমিতে স্রেফ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বাসনায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গ্রামগুলোয় আগুন লাগিয়েছে।

তিনি লিখেছেন,

“আমি তখন বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের জন্য কাজ করছিলাম। ছিলাম দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্ব পরিষেবার প্রধান ভাষ্যকার। কাজটি ছিল লন্ডনভিত্তিক। তবে আমাকে নিয়মিত দক্ষিণ এশিয়ায় ভ্রমণ করতে হতো। ১৯৭১ সালে সামরিক হামলার পরে সেই সময়ের পূর্ব পাকিস্তানে যে সাংবাদিকদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তাদের প্রথম দলে আমি ছিলাম। সারা দেশে আমাদের মোটামুটিভাবে অবাধে ভ্রমণ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এর আগে সাংবাদিকদের আরেকটি দল এসেছিল। কিন্তু তারা একদমই স্বাধীনভাবে ঘুরতে পারেনি। সেটি ছিল, যাকে বলে, একরকমের নিয়ন্ত্রিত ভ্রমণ।”

তিনি আরও যোগ করেন,

“সে সময় আমরা যা দেখেছি, যা শুনেছি, তা ছিল হামলার প্রমাণ। সেনারা সেনানিবাস থেকে যে গুলি করতে করতে বের হয়ে এসেছিল, আমরা স্পষ্ট তা বুঝতে পেরেছি। যে ক্ষতি তারা করেছিল, তা আমরা দেখেছি। দেখেছি বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমন ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে যখন ঢাকার বাইরে গেলাম—যেমন রাজশাহীর কথা বলতে পারি—দেখলাম যে রাস্তার পাশের প্রায় প্রতিটি গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। স্পষ্টভাবেই এই ভূমিতে স্রেফ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বাসনায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গ্রামগুলোয় আগুন লাগিয়েছে। বল প্রয়োগ করে বাসিন্দাদের গ্রামছাড়া করেছে, যেন তারা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারে।”

একাত্তরে বাংলাদেশের সঙ্গে মার্ক টালির যে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, সেটি আজীবন অটুট ছিল। পেশাগত কারণে তিনি বহুবার এখানে এসেছেন, অনেক রাজনীতিকের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ জানিয়েছেন। ২০১২ সালে তাঁকে দেওয়া হয় মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা।

বাংলাদেশ নিয়ে মার্ক টালির আগ্রহের আরেকটি কারণ তাঁর মায়ের জন্ম আখাউড়ায়। মনে পড়ে, ১৯৯৪ সালে তিনি বিবিসির কোনো কাজে একবার বাংলাদেশে এসেছিলেন। সে সময়ে বিবিসির হয়ে ঢাকায় কাজ করতেন আতাউস সামাদ। তিনিই আমাকে তাঁর একটি সাক্ষাৎকার নেওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। শেরাটন হোটেলে তাঁর কক্ষে আমাদের কথোপকথন শুরু হয়।

বাংলাদেশের রাজনীতির পাশাপাশি উপমহাদেশজুড়ে মৌলবাদী শক্তির উত্থান নিয়েও কথা হয়। এর বছর দুই আগে ভারতে হিন্দু মৌলবাদীরা বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে, যার অভিঘাত এসে পড়ে এখানেও। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হয় দুই দেশেই। মার্ক টালির একটি কথা আজও কানে বাজে—সমাজের পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মধ্যে যে মৌলবাদী রাজনীতির প্রসার ঘটছে, তার পেছনে বঞ্চনাও কম দায়ী নয়। তিনি বলেছিলেন, যারা ধর্মীয় রাজনীতি করেন, তারা সমাজের অবহেলিত শ্রেণি। ভদ্রলোকদের ড্রয়িংরুমে ঢুকতে পারেন না, বারান্দা থেকেই বিদায় হতে হয়। তাঁর কথাগুলো এখনো প্রতিধ্বনিত হয়।

মার্ক টালি ১৯৬৪ সালে বিবিসিতে যোগ দেন। পরের বছর দিল্লিতে দায়িত্ব নিয়ে আসেন। ১৯৯৪ সালে বিবিসি থেকে অবসর নেওয়ার আগে ২০ বছর তিনি দিল্লিতে ব্যুরোপ্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। বিবিসি থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি ভারতে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। নিজে দুটি রেডিও প্রতিষ্ঠান করেন।

সাংবাদিকতার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন মার্ক টালি। তার মধ্যে রয়েছে— Amritsar: Mrs Gandhi’s Last Battle, Raj to Rajiv: Forty Years of Indian Independence, No Full Stop in India, An Ending Journey, India: The Road Ahead, Heart of India।

একাত্তরের বেশির ভাগ সময় মার্ক টালি বিবিসির সদরদপ্তরে ছিলেন। তাঁর ভাষায়,

“আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম তখন মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপক প্রচার দিয়েছিল। মার্কিন গণমাধ্যম তাদের সরকার সহানুভূতিশীল না হওয়া সত্ত্বেও ইতিবাচক প্রচার দিয়েছিল। প্রতিদিন আমি প্রতিবেদনগুলো পড়তাম এবং বিবিসির জন্য নিজের ভাষ্য তৈরি করতাম। এসব প্রতিবেদনের পাশাপাশি বাংলাদেশি প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যও যোগ করতাম। এদের বলা হতো ‘স্ট্রিংগার’। তারা খুবই সাহসী ছিলেন। বিবিসির স্ট্রিংগারের নাম ছিল নিজামউদ্দিন। তিনি একজন বুদ্ধিজীবী ছিলেন। খুব ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতেন। পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে।”

তিনি আরও লিখেছেন,

“মানুষ বিবিসির ওপর খুব নির্ভর করত। পাকিস্তান রেডিও ছিলই, তারা পাকিস্তানি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরত। অল ইন্ডিয়া রেডিও ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরত। বিবিসি ছিল প্রধান বিদেশি চ্যানেল। ধরে নেওয়া হতো, আমরা নির্ভরযোগ্য সংবাদ প্রচার করছি। আশা করি, আমরা তা করতামও। ফলে বাংলাদেশে আমাদের খুব সম্মান করা হতো। তবে পশ্চিম পাকিস্তানে যে আমরা খুব সমীহ পেতাম, তা বলা যাবে না।”

ভারতে বিবিসির হয়ে দায়িত্ব পালনকালে মার্ক টালি ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, ভোপাল ট্রাজেডি, অপারেশন ব্লু স্টার, ইন্দিরা গান্ধী হত্যা, শিখবিরোধী দাঙ্গা, রাজীব গান্ধী হত্যা এবং বাবরি মসজিদ ধ্বংস নিয়ে বিশ্লেষণী পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। এতে কোনো পক্ষ খুশি হয়েছে, কোনো পক্ষ ক্ষুব্ধ হয়েছে। বাবরি মসজিদের প্রতিবেদন করতে গিয়ে তিনি বিপদেও পড়েছিলেন।

শেষ দিকে সাংবাদিকতা নিয়ে তাঁর হতাশাও ছিল। ২০০০ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, টিভি সাংবাদিকতার মান মারাত্মকভাবে নেমে গেছে। শুধু সাক্ষাৎকারনির্ভর সংবাদ, তৃণমূলের মানুষের ভাবনা উপেক্ষা এবং ফলোআপের অভাব—এসব তিনি কাঙ্ক্ষিত মনে করেননি।

মার্ক টালি মনে করতেন, শুধু গণমাধ্যম নয়, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোও দুর্বল হয়ে পড়েছে। সবল হয়েছে পুলিশ ও আমলাতন্ত্র। রাজনৈতিক স্বার্থে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহারের ফলে ন্যায়বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশের আত্মার আত্মীয় সাংবাদিক মার্ক টালির প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

 

সোহরাব হাসান :  কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক। সম্পাদক- চরচা 

প্রকাশিত বই: বাতিল রাজদণ্ড; কালো বারুদ; সাদা গোলাপ; সুন্দর তোমার সর্বনাশ; শূন্যতার কাছে প্রার্থনা; ভুল করে বেঁচে আছি; নির্বাচিত কবিতা; তৃতীয় বিশ্বের কবিতা (সম্পাদনা)

প্রবন্ধ: মুজিব ভুট্টো মুক্তিযুদ্ধ; নেই গণতন্ত্রের দেশে;  ১৯৭১ এর শত্রু মিত্র; স্বাধীনতার প্রস্তুতি পর্ব- শেখ মুজিবের আগরতলা মিশন; রাওয়ালপিণ্ডি ষড়যন্ত্র- ১৯৫১; শহীদ মতিউরের নোটখাতা। 

বসবাস : ঢাকা, বাংলাদেশ।