বিএনপি ও জামায়াতের দ্বৈরথ সংসদেই সীমিত থাকছে না । সোহরাব হাসান

বিএনপি ও জামায়াতের দ্বৈরথ সংসদেই সীমিত থাকছে না । সোহরাব হাসান

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন কি ক্ষমতাসীন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের মধ্যকার রাজনৈতিক বিরোধ মেটাতে পেরেছে?

সোজা কথায়, পারেনি। সংসদের অধিকাংশ সময় ব্যয় হয়েছে জুলাই সনদ, গণভোট, সাংবিধানিক আদেশ ইত্যাদি নিয়ে বিতর্কে। বিএনপি নেতৃত্ব জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করলেও বিরোধী দল তাতে আশ্বস্ত হয়নি। তারা জুলাই সনদসহ অন্যান্য দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তিন মাসব্যাপী আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

 

এই অধিবেশনে বহু বিল পাস হয়েছে, নানা বিতর্ক হয়েছে; কিন্তু জনজীবনের জ্বলন্ত সংকট নিয়ে আলোচনা ছিল তুলনামূলক কম। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জ্বালানি সংকট, হামের প্রাদুর্ভাব, হাওর অঞ্চলে বন্যায় ফসলহানি, বেকারত্ব এবং নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়নি।

বিরোধী দল শুরু থেকেই ১৮০ দিনের জন্য জাতীয় সংসদকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ ঘোষণার দাবি জানিয়ে আসছে। তারা দুটি শপথও নিয়েছেন—একটি সংসদ সদস্য হিসেবে, অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। কিন্তু বিএনপি যেই সাংবিধানিক আদেশের ভিত্তিতে এটি করা হয়েছে, সেটিকেই অবৈধ বলে দাবি করেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় যে সনদে তারা প্রথম স্বাক্ষর করেছিলেন, তা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে। তবে সাংবিধানিক আদেশের নামে যা করা হয়েছে, তা মানতে তারা বাধ্য নন।

বিরোধী দলের বক্তব্য, গণভোটে যেখানে ৬৮ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিয়েছে, সেখানে কোনো দলের আপত্তি বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ গ্রহণযোগ্য নয়। প্রশ্ন উঠেছে—গণভোটের রায়, নাকি জাতীয় সংসদ নির্বাচন—কোনটি অগ্রাধিকার পাবে? সরকার পক্ষের বক্তব্য, জাতীয় সংসদকে বাইরে থেকে নির্দেশ দেওয়া যায় না যে কোন আইন পাস বা বাতিল করতে হবে। তা হলে সংসদের সার্বভৌমত্ব থাকে না।

বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পরই ইরান-মার্কিন যুদ্ধ শুরু হয়, যার প্রভাবে জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। এরপর দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, যাতে তিন শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটেছিল, তারও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। জনজীবনে নিরাপত্তাহীনতা রয়ে গেছে। কিন্তু সংসদের প্রথম অধিবেশনে এসব নিয়ে আলোচনা ছিল সীমিত।

বিরোধী দল শুরুতে রাষ্ট্রপতি মো. শাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ দাবি করলেও পরে তাঁর ভাষণের ওপর আলোচনায় সক্রিয় অংশ নেয়।

সরকারি দল চেয়েছে, বিরোধী দল যেন জনজীবনের সংকট নিয়ে কম কথা বলে। এ কারণে তারা বিরোধী দলকে অতীতের নানা ইস্যুতে ব্যস্ত রেখেছে। বিরোধী দলের দুর্বলতা জেনেই তারা আলোচনাকে অতীতকেন্দ্রিক রাখতে সচেষ্ট ছিল এবং অনেকটাই সফলও হয়েছে। যেসব বিষয়ে সরকারের জবাবদিহি কম, সেসব বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। আর যেসব বিষয়ে সরকারের জন্য অস্বস্তি তৈরি হতে পারে, সেগুলো দ্রুত শেষ করা হয়েছে ‘হবে’ ও ‘করব’-জাতীয় আশ্বাস দিয়ে।

তবে সবক্ষেত্রে এমন হয়নি। যেসব বিষয়ে উভয় পক্ষ রাজনৈতিকভাবে লাভজনক মনে করেছে, সেখানে তারা আপসেও দ্বিধা করেনি। যেমন উপজেলা পরিষদে এমপিদের জন্য আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা কিংবা আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করা।

অথচ অন্তর্বর্তী সরকার যখন এই অধ্যাদেশ জারি করেছিল, তখন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা বলেছিলেন, তারা আইন করে কোনো দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে নন। কিন্তু এখন তারাই সেই অধ্যাদেশকে সমর্থন দিলেন।

রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব আনার দিন বিরোধী দল সংসদ বর্জন করেছিল এই যুক্তিতে যে তারা ‘ফ্যাসিস্ট’ সরকারের রাষ্ট্রপতিকে মানে না। কিন্তু সেই অবস্থান শেষ পর্যন্ত টেকেনি। অধিবেশনের শেষ দিনে ধন্যবাদ প্রস্তাবে ভোটাভুটির সময় তারা ‘না’ ভোট দিলেও অধিবেশন বর্জন করেনি। ফলে প্রস্তাব সহজেই পাস হয়ে যায়।

সংসদের রেওয়াজ অনুযায়ী প্রথম অধিবেশন এবং বছরের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি ভাষণ দেন। তবে সেই ভাষণ মূলত ক্ষমতাসীন দলেরই রচিত। অতীতে আবদুর রহমান বিশ্বাস, বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ ও অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মদও এমন ভাষণ সংসদে পাঠ করেছেন। এর মধ্যে ব্যতিক্রম ছিলেন সাহাবুদ্দীন আহমদ। তিনি লিখিত ভাষণের পাশাপাশি নিজের মন্তব্যও যোগ করতেন। বলতেন, গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে সরকারি ও বিরোধী দলকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে এবং পরমতসহিষ্ণুতা দেখাতে হবে।

বর্তমান সংসদের বিরোধী দল রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যের কথা বলছে। বিএনপির ৩১ দফা ও জুলাই সনদেও এই ভারসাম্যের কথা আছে। কিন্তু রাষ্ট্রপতিকে যদি কেবল সরকারি দলের লিখিত ভাষণই পাঠ করতে হয়, তাহলে সেই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে কীভাবে—এই প্রশ্ন খুব কমই উঠেছে।

সংসদের সমাপনী ভাষণে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, গণতন্ত্রকে সফল করতে সরকারি ও বিরোধী দলকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, “এই সংসদকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না।” একই সঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, প্রধানমন্ত্রীত্বের চেয়ার যতটা আরামদায়ক মনে হয়, বাস্তবে ততটাই “আগুনের তাপ” অনুভূত হয়।

তবে সেই তাপ কোথা থেকে আসছে, তিনি স্পষ্ট করেননি। বিরোধী দলের বক্তৃতা-বিবৃতি থেকে মনে হয়নি তারা সরকারকে খুব বেশি চাপে ফেলতে পেরেছে। বরং তারা সরকারি দলের আক্রমণ সামলাতেই বেশি সময় ব্যয় করেছে। শুরুতে কিছুটা আক্রমণাত্মক থাকলেও শেষদিকে তারা রক্ষণাত্মক অবস্থানে চলে যায়।

তাই আগুনের তাপ বিরোধী দল থেকে নয়, বরং সরকার ও সরকারি দলের ভেতর থেকেই আসার সম্ভাবনা বেশি। নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ না হলে, জনজীবনের সংকট আরও বাড়লে কিংবা দলীয় নেতা-কর্মীদের দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সেই তাপ আরও বাড়বে।

সংসদ নেতা আরও বলেছেন, তিনি জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নয়, সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে চান। কিন্তু গত আড়াই মাসে সরকারের সিদ্ধান্তগুলোতে জনতুষ্টিকেই বেশি গুরুত্ব দিতে দেখা গেছে। কঠিন চ্যালেঞ্জগুলো এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাও স্পষ্ট।

সংসদ নেতার আগে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং আগামী বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানান। এই দাবি অবশ্যই সমর্থনযোগ্য। একটি দেশকে মানবসম্পদে সমৃদ্ধ করতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই।

তবে ইতিহাস নিয়ে তাঁর বক্তব্যে প্রশ্ন উঠেছে। তিনি বায়াত্তরের সংবিধানকে সম্মান না জানানোর পক্ষে জিয়াউর রহমানের উদাহরণ টেনেছেন। অথচ জিয়াউর রহমান সংবিধানের মৌলিক কাঠামো বাতিল করেননি; বরং চতুর্থ সংশোধনীর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। তবে একটি বিষয়ে জামায়াত তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হতে পারে—বায়াত্তরের সংবিধানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল, যা জিয়া সামরিক ফরমানের মাধ্যমে তুলে দেন।

শফিকুর রহমান তাঁর ভাষণে ১৯৪৭-এর কথা স্মরণ করলেও ১৯৭১-এর কথা উল্লেখ করেননি। তিনি বলেছেন, “সাতচল্লিশ এই ভূখণ্ড দিয়েছে।” কিন্তু বাস্তবতা হলো, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। সাতচল্লিশকে অতিক্রম করেই একাত্তর এসেছে।

ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে ১৯৪৭ স্মরণীয়, কিন্তু জাতির আত্মা ও চেতনায় ধারণ করার বিষয় ১৯৭১। যারা এই পার্থক্য বোঝেন না, তাদের ইতিহাসবোধ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অনুভূতির সঙ্গে মিলবে না।

সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হয়েছে। জুনে শুরু হবে বাজেট অধিবেশন। সেখানেও রাজনৈতিক বিরোধের সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা কম। সম্ভবত এ কারণেই বিরোধী দল জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে তিন মাসব্যাপী আন্দোলনের কর্মসূচি দিয়েছে। জামায়াত তুলনামূলক ধীরগতির কৌশল নিলেও তাদের সহযোগীরা—বিশেষ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি—ছাড় দিতে রাজি নয়।