শতবর্ষ পরের ‘রক্তকরবী’: সিডনির অডিটোরিয়ামে অনবদ্য রূপায়ণ । অনীলা পারভীন
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী নাটক ‘রক্তকরবী’ বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। মানুষের সীমাহীন লোভ, যন্ত্রকৌশল ও ক্ষমতার যাঁতাকলে পিষ্ট মানবতা কীভাবে নন্দিনীর রূপ, ভালোবাসা ও প্রতিবাদের সুবাতাসে জেগে ওঠে, সেই চিরন্তন সত্যই ধ্বনিত হয়েছে ‘রক্তকরবী’-তে। সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রবীন্দ্র-ভাবনার প্রাসঙ্গিকতা হ্রাস পাওয়ার পরিবর্তে যেন দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
০৪ অক্টোবর, ২০২৬, রোববার সন্ধ্যায় ‘আঙ্গিক থিয়েটার সিডনি’-এর পরিবেশনায় সিডনির ব্রায়ান ব্রাউন অডিটোরিয়ামে প্রদর্শিত হলো সেই কালজয়ী রূপকের এক আধুনিক ও ব্যতিক্রমী মঞ্চায়ন, ‘Red Oleanders’।
রাহুল গাঙ্গুলীর নির্দেশনায় নাটকটি মঞ্চস্থ হয় মূল ‘রক্তকরবী’র ছায়া অবলম্বনে; যেখানে মূল ভাবনাটিকে অক্ষুণ্ণ রেখে ১০০ বছর পরের ‘রক্তকরবী’র আখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। এই সুদূরপ্রসারী ভাবনা ও সময়োপযোগী নাট্যনির্মাণ উপস্থিত দর্শকদের নতুনভাবে চিন্তা করার সুযোগ করে দিয়েছে।
সমগ্র মঞ্চায়নে আলোকসম্পাত, শব্দপরিকল্পনা এবং মঞ্চসজ্জায় ছিল এক কথায় অসাধারণ পেশাদারিত্বের ছাপ।
অভিনয়শিল্পীদের সকলেই চমৎকার অভিনয় করেছেন। যার মধ্যে আফসানা রুচি, তাসলিম আহমেদ বাপ্পি, অপু সাহা, অরিজিৎ বড়ুয়া শাওন এবং ফয়সাল সিদ্দিকীর অভিনয় ছিল অনন্যসাধারণ। বিশেষ করে মূল চরিত্র ‘নন্দিনী’ রূপে আফসানা রুচির অভিনয় সবাইকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। তাঁর বাচিক ও আঙ্গিক অভিনয়ের মুনশিয়ানা ছিল প্রশংসনীয়।
সবচেয়ে চমকপ্রদ ও আশাব্যঞ্জক দিক ছিল এই প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের অংশগ্রহণ। অভিজ্ঞ অভিনয়শিল্পীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তরুণদের সাবলীল উপস্থাপনা পুরো নাটকটিতে এক নতুন প্রাণস্পন্দন সঞ্চার করেছে। তরুণদের আত্মবিশ্বাস ও অভিনয়দক্ষতা প্রমাণ করে, বিদেশের মাটিতেও আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ কতটা উজ্জ্বল।
রবীন্দ্রসংগীতের পাশাপাশি নাটকে লালন ও হাসনরাজার গানের সংযোজন এক ভিন্ন মাত্রা তৈরি করেছে। যদিও রবীন্দ্রসংগীতের ব্যবহার আরেকটু বেশি থাকলে পরিবেশনাটি আরও পূর্ণতা পেত। এছাড়া শতবর্ষ পরের ‘রক্তকরবী’র প্রেক্ষাপটে বর্তমান সময়ের বৈশ্বিক ও সামাজিক সংকটময় পরিস্থিতিগুলোর সংমিশ্রণ আরেকটু নিবিড়ভাবে ঘটানো গেলে তা বর্তমান প্রজন্মের দর্শকদের কাছে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক ও অর্থবহ হয়ে উঠত।
এর পরও এটি নিঃসন্দেহে একটি চমৎকার পরিবেশনা, যা সিডনির দর্শকদের পরিপূর্ণ আনন্দ দিয়েছে।
প্রবাসের ব্যস্ত জীবনের মাঝেও বাংলা নাটক ও বিশ্বকবির সাহিত্য নিয়ে এমন মানসম্মত এবং চিন্তাশীল নাট্যপ্রয়াস সত্যিই প্রশংসনীয়। এই পুরো প্রযোজনা দল এবং বিশেষ করে নবীন শিল্পীদের উত্তরোত্তর সাফল্য ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি। প্রবাসে বাঙালি সংস্কৃতিচর্চার এই ধারা অব্যাহত থাকুক।
লেখক: শিশু সাহিত্যিক




