অলৌকিক গল্পগুলো । অজয় দাশগুপ্ত

অলৌকিক গল্পগুলো । অজয় দাশগুপ্ত

দেশে এখন অলৌকিকত্বের জয়জয়াকার। এতো অলৌকিকতা আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি। মূলত ধার্মিক আর সৎ মানুষের হাত থেকে ছুটে গেছে সবকিছু। এখন যারা অন্ধকারের দিকে টানে, তারা ধর্ম মানে না।

এই যে আমাদের দশভূজা দুর্গা, যারা মনে করেন কেবলই মাটির প্রতিমা, তারা মূর্খ। ঘরে ঘরে মায়েদের অদৃশ্য দশ হাতের ভেতরই দুর্গা আছেন। আছেন বলেই স্বামী, সন্তান, আত্মীয়-অনাত্মীয়দের একসাথে ধরে রাখেন আমাদের মা। সেই তিনিই আসেন মাটির প্রতিমা হয়ে। আমাদের জানতে দেন, পৃথিবীতে অসুর নিধন এখনো শেষ হয়নি। সে গল্প আমাদের জানা। আসুন, এবার আমরা অলৌকিক স্পর্শের কিছু গল্প জানি, যার ভেতরে দুর্গার মতো দেবীও থাকেন, আছেন এবং থাকবেন।

অলৌকিক বলে কি আসলেই কিছু আছে? না এটা সম্পূর্ণ মনোজাগতিক? এ নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রচুর তর্ক হয়েছে, চলছে এবং চলবে। সে হোক, আমি সংশয়বাদী মানুষ। ঈশ্বর ও প্রকৃতি, শূন্য ও মহাশূন্য—দুইই টানে সমানভাবে। কয়েকটি ছোট্ট ঘটনার কথা বলছি, যার সবগুলোই সত্য অথচ ব্যাখ্যাহীন।

বাংলাদেশের জনপ্রিয়তম লেখক হুমায়ূন আহমেদ। তাঁকে আপনি গালমন্দ করতে পারলেও এড়াতে পারেন না। চমৎকার গদ্য লিখতেন। একবার লিখেছিলেন, তাঁর এক আমেরিকা-প্রবাসী বন্ধুর সাথে রাতে ঘুরছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। ঘুরতে ঘুরতে রাতদুপুরে তাদের চায়ের তেষ্টা পেলে তারা এগোতে থাকলেন চায়ের দোকানের দিকে। দেখলেন, ওদিক থেকে হনহন করে হেঁটে আসছেন একজন পাগল-কিসিমের মানুষ। দূর থেকে দেখেই বুঝলেন, রাতবিরাতে ঘুরে বেড়ানো মানুষ। উদোম গা, লুঙ্গি আর হাতে কিছু একটা।

হুমায়ূন আহমেদ লিখছেন, তাঁর খুব ইচ্ছে হচ্ছিল এই পাগলা লোকটিকে বলেন, “সালাম আলাইকুম।” কিন্তু পারছেন না। পাশে আমেরিকা-প্রবাসী বিজ্ঞানী বন্ধু। ভাববে, ও মুখে মুখে প্রগতিশীলতা আর রাতদুপুরে ফকির দেখে ভক্তিতে গদগদ। তো তাঁরা হাঁটছেন, পাগলাও এগিয়ে আসছেন। কাছাকাছি হতেই লোকটি হুমায়ূন আহমেদের দিকে তাকিয়ে বেশ জোর গলায় হাঁক দিয়ে বলেছিলেন, “ওয়ালাইকুম আসসালাম।” স্তম্ভিত, বিচলিত হুমায়ূন আহমেদ থতমত খেয়ে গেলেন বটে, কিন্তু এর জট খুলতে পারেননি কোনোদিন।

আমি তখন চট্টগ্রামে। একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকে চাকরি করি। আমি কাজ করতাম জেনারেল ম্যানেজারের অফিসে। সেখানে দারোয়ান, পিয়ন, মেসেঞ্জারের ছড়াছড়ি। এর ভেতর একজন ছিলেন, যিনি দেখতে ছোটখাটো। যতদূর জেনেছি, দুই বিবি নিয়ে থাকেন। সংসারও কম বড় না। কিন্তু কাজে ফাঁকি দেওয়ার লোক ছিলেন না। যেটা হয়, ফাইফরমাশ খাটলে সবাই কিছু না কিছু দেয়। একে কিছু দিলে পাইপয়সা হিসেব করে ফেরত দিতেন।

আমার প্রতি তার কেমন জানি একটা টান ছিল। জানত, আমি চা খাই। ভালোবাসি চা পান করতে। অন্যদের জন্য আনলেও এক কাপ আমার টেবিলে হাজির হবেই। মাঝে মাঝে এমন সব কথা বলত আর কাজ করত, আমি বেশ হিমশিম খেয়ে যেতাম তার কারণ খুঁজে বের করতে।

একবার হৈচৈ কাণ্ড। আমাদের অফিসে এলেন ব্যাংকের এমডি। বাংলাদেশে যা হয়—পারলে তার জুতা সাফ করে দিতে প্রস্তুত একশ জন। আমরা তখন নবীন অফিসার। কে আমাদের খবর রাখে? ব্যাংকের ফ্লোরজুড়ে একটা ছোট কাঁচঘেরা রুম ছিল, মন্দিরের মতো। সেখানে ঢুকতে জুতা খুলতে হতো। আর যখন-তখন বা যে-ইউ ঢোকা মানে পরদিন পাহাড়-জঙ্গলে বদলি। যে দুজন ঐ রুমে বসতেন, তাদের হাবভাব ছিল আলাদা। তারা যে কী করতেন, কেন করতেন, কেউ জানত না। এখন বুঝি, সারাদিনে দু-একটা এক্সেল শিট তৈরি করা ছাড়া আর কিছুই হতো না ওখানে।

সে যাই হোক, যেদিন এমডি এলেন, সাজসাজ রব। সন্ধ্যার পর তিনি ঢুকলেন সে রুমে। বাইরে ফ্লোরে আমরা যার যার আসনে দাঁড়িয়ে। যত সময় তিনি ফ্লোরে থাকবেন, তখন কেউ বসবে—এটা কি হয়? দেশি কায়দায় আদব বলে কথা।

আমার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন সেই লোক, ইলিয়াস আলী। বিড়বিড় করে সুরা বা কিছু পাঠ করা তার স্বভাব। তেমন কিছু করছিল মনে হয়। হঠাৎ একটা বড় ফুঁ দিয়ে আমাকে ফিসফিস করে বলল, “এমডি সাহেব কিন্তু এখন আপনার কাছে আসবে।”

আমিতো বিরক্তির চরমে। চাপা গলায় জোর দিয়ে বললাম, “চুপ কর। তোর কিন্তু খবর আছে আজকে।” দেখি মিটমিট করে হাসছে। আমার রাগ তখন চরমে।

এমডি কম্পিউটার রুম থেকে বেরিয়ে গটগট করে জিএম চেম্বারের দিকে যাবার পথে হঠাৎই ঘুরে দাঁড়িয়ে সোজা মাঝখানের সারিতে আমার সামনে। আমার তো রীতিমতো ঘাম বেরুচ্ছে। বলে কী! আমি কী কাজ করি, কী কী দেখি—এসব দু-একটা মামুলি প্রশ্ন করেই পাশে দাঁড়ানো বড় এক কর্তাকে বললেন, “একে আমাদের হেড অফিসে বদলি করুন। পাবলিক রিলেশনস অফিসার হিসেবে।”

পাশের কর্তাতো পারলে আমাকে তখনই ট্রেনে তুলে দেয়। আমার তখন মাথা ঘুরছে। বলা নাই, কওয়া নাই—আমি যাব ঢাকায়? পাবলিক রিলেশনস যতটা আর যতবেশি আকর্ষক হোক না কেন, আমিতো প্রস্তুত না তখন। তখন আমার অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন ভিসা হাতের মুঠোয়। সেটা ভিন্ন কাহিনি।

হঠাৎ করে এমডি পোর্টফোলিওর কেউ আমার কাছে চলে আসবেন, তাও ইলিয়াস হুজুরের আগাম বলা কথা মতো? এ ঘটনার কোনো ব্যাখ্যা আমি পাইনি আজও। যেমন পাইনি অন্ধ হাফেজের বাণীর ব্যাখ্যা। যিনি আমার হাত ধরে বলেছিলেন, “বিদেশেই যাবে। ওখানেই হবে যা হবার।”

তারুণ্যে বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলতে পছন্দ করতাম। আসলে স্বপ্নগুলো সফল হতো না তো—এভাবে বলেই আমরা শান্তি পেতাম হয়তো। সন্ধ্যায় আমি প্রায়ই চট্টগ্রাম রামকৃষ্ণ মিশনে যেতাম। একবার গিয়ে দেখি, স্বামীজি এসেছেন ঢাকা থেকে—স্বামী অক্ষরানন্দজী। আমিও গেলাম একান্তে দেখা করতে। কী চমৎকার গৈরিক বসন। মাথায় টুপি। দেখে-শুনে মুগ্ধ আমি তাঁকে বললাম, “সাধু হতে চাই। কী করতে হবে?”

সব শুনে স্মিতহাস্যে বললেন, “তোমার দরকার নাই সাধু হবার। তুমি যা ভালোবাসো, তাই করো।”

আমি আমার ছোট লাল নোটবইটা মেলে দিয়ে কিছু লিখে দিতে অনুরোধ জানালে তিনি আমাকে বিস্মিত করে লিখেছিলেন—“আজীবন সত্য কথা বলিবে।”

আমি তখন ঘামছি। আমি যে মিথ্যা বলি, উনি জানলেন কীভাবে? সেই বোধহয় আমার বানিয়ে বানিয়ে বলা গল্পের শেষকাল।

এমন অভিজ্ঞতা বিদেশেও ঘটেছে। বারান্তরে বলা যাবে সে সব।