যে আলো ছড়িয়ে গেল সবখানে । অজয় দাশগুপ্ত

যে আলো ছড়িয়ে গেল সবখানে । অজয় দাশগুপ্ত

বই প্রকাশনা নিয়ে এত বড় কোনো অনুষ্ঠান আগে দেখিনি। সিডনির বাঙালি ও বাংলা ভুবন এখন অনেক বড়। তার সীমানা আকাশ ছুঁইছুঁই করছে। তারই একখণ্ড আকাশ নেমে এসেছিল লাল গোলাপ মিলনায়তন তথা রেড রোজ ফাংশন সেন্টারে।

যাঁকে নিয়ে এই গ্রন্থ, তাঁকে সবাই ডাকেন বটবৃক্ষ বলে। বটবৃক্ষ হয়ে ওঠা সহজ কিছু না। বিশেষত বাঙালি জনগোষ্ঠীর ভেতর সর্বজনগ্রাহ্য হয়ে ওঠা সবচেয়ে কঠিন বিষয়। সে কাজটি যে গামা ভাই করে ফেলেছেন, তার প্রমাণ মিলল এই অনুষ্ঠানে।

অর্ধশতাধিক মানুষ লিখেছেন এই গ্রন্থে। প্রবীণ অভিবাসী ফখরুদ্দিন চৌধুরী, ড. মোহাম্মদ আবদুর রাযযাক, ড. রেনু দেব-দাশ, ড. আলী কাজী যেমন আছেন, তেমনি আছে তরুণ-তরুণীদের লেখা। এটি যেহেতু বইয়ের আলোচনা নয়, তাই বরং অনুষ্ঠানে ফিরে যাই।

তিনশ পৃষ্ঠার অধিক এই গ্রন্থের উপদেষ্টা পরিষদের চারজন, সম্পাদনা পরিষদের তিনজন, উপস্থাপক, প্রধান অতিথি এস এম আব্রাহাম লিংকনসহ মঞ্চ আলোকিত করে বসেছিলেন গামা ভাই।

কী আশ্চর্য! এতগুলো মানুষ কথা বললেন সময় মেপে। বাঙালি নিয়মমতো এরা কাউকে বিরক্ত বা অসহিষ্ণু করে তোলার আগেই ভাষণ থামিয়ে দিয়েছিলেন। কেবলমাত্র প্রধান অতিথি একটু বেশি সময় নিয়ে দৃপ্ত কণ্ঠে নিজের কথা বলেছিলেন, যা মানুষ মনোযোগ দিয়ে শুনেছিল।

তবে হ্যাঁ, এর বাইরে কারও একটু পরিমিতির অভাব তো ছিলই। পুনরাবৃত্তি আর অতিকথন যে বাহুল্য, সেটা কেউ কেউ বোঝে না। ভাবে, যত বলা যায় তত লাভ।

দুটি শিশু, যারা সম্পর্কে গামা ভাইয়ের নাতি-নাতনি, তারা তাদের মতো করে ভালোবাসা জানিয়েছিল শুরুতে। পাঠক, লেখক, সুধীসমাবেশ থেকে অতিথিরাও বলেছিলেন, তবে তা কখনো সময়ক্ষেপণের কথা মনে করিয়ে দেয়নি।

সেদিন গান, নাচ, কবিতা মিলে জমজমাট এই অনুষ্ঠানের মূল নায়ক যেমন গামা ভাই, তেমনি এর নায়িকা ছিল সুসম্পাদিত গ্রন্থ “প্রশান্ত পারের বাঙালি নাবিক”

সব লেখার কথা বলতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু সীমাবদ্ধতা তা হতে দেয় না। পরিসর, কলেবর ও পরিমিতিবোধের কারণে থামতে হয়।

যাঁরা হৃদয় ছোঁয়া লিখেছেন, তাঁদের জন্য ভালোবাসা। তবে এ কথা মানতেই হবে, ৫৫ জন লেখকের কলমে উঠে আসা একজন মানুষ বহুমাত্রিক এক বাঙালি। যেটা সবাই স্বীকার করেছেন, এই মানুষটি হৃদয়বান। মানুষের আপদ-বিপদে ছুটে আসা তাঁর স্বভাব।

একজন লিখেছেন, যখন তাঁর সঙ্গে কারও দেখা হয়, তখন তাঁর হাতে একটা রুটি থাকলে তিনি প্রথমেই তার অর্ধেক ছিঁড়ে দেন। তারপর খাবারের অর্ডার। খুব সহজ, অথচ কী প্রাণস্পর্শী লেখা।

যাঁকে শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না, হতাশ জনের আলোর শিখা, যার কাছে নারীর সমতা দয়া নয়, দর্শন; পান্থজনের সখা, ক্লান্তিহীন এক পরিব্রাজক, অস্ট্রেলিয়ায় বাঙালির প্রথম ঠিকানা, নিদানকালের বন্ধু, নিঃশব্দ আলোর মানুষ, রাজত্ব নেই তবু তিনিই রাজা—এই শিরোনামগুলো কল্পিত বা শুধু আবেগের হতে পারে না। এগুলো হৃদয়-মথিত ভালোবাসা থেকে উৎসারিত।

যে লেখাটি মহাভারতের কথা ও স্কন্ধনাগের উপমায় সিক্ত, সেটি কালজয়ী গল্পের মতো মনে হয়েছে। যেমন লেগেছে কারও কারও সরল স্বীকারোক্তি।

বইটি কে পড়বে, কারা পড়বে, জানি না। তবে না পড়লে দেশ ছেড়ে আসা অথচ রক্তধারায় জন্মভূমি বয়ে বেড়ানো এক মানুষকে চেনা যাবে না। বোঝা যাবে না কীভাবে কষ্টের বিষ ধারণ করেও নীলকণ্ঠ হওয়া যায়। সেই নীলকণ্ঠ মানুষ কীভাবে অমৃত বিতরণ করতে পারে।

কথায় বলে, Never judge a book by its cover. দৃষ্টিনন্দন, সুসজ্জিত প্রচ্ছদে মোড়ানো বইটিকে আপনি কভার দিয়ে মূল্যায়ন করলেও ঠকবেন না। বলাবাহুল্য, এই কাজটির জন্য প্রচ্ছদশিল্পী ও মুদ্রাকরকে অভিনন্দন। তরুণ প্রকাশক মিঠু আমার দুটি বইয়ের প্রকাশক। ও কাজে নিপুণ, লক্ষ্যে অটল।

যে কথা বলে শেষ করব, হীনতা, দৈন্য, সমালোচনা, আত্মঅপমানে জর্জরিত বাঙালি সমাজে এ ধরনের একটি গ্রন্থ প্রকাশ বিরল ঘটনা। গামা ভাইয়ের নিদানকালের বন্ধু আব্রাহাম লিংকন, ড. সিরাজুল হক, ড. সুলতান মাহমুদ, শফিকুল আলম, রোকেয়া আহমেদ, নোমান শামীমরা ছাড়া যা সম্পূর্ণ হতো না।

অনুষ্ঠানটি সফল হয়েছে মানুষ এসেছিল বলে। শীতার্ত সন্ধ্যা উপেক্ষা করে উষ্ণ ভালোবাসায় জড়ো হওয়া মানুষগুলো না হলে কিছুই কিছু মনে হতো না।

রবীন্দ্রনাথ বলেন,

ভীমরুল কহে, আছে সহস্র প্রমাণ,
তোমার দংশন নহে আমার সমান।
নিরুত্তর মধুকর, ছলছল আঁখি,
বনদেবী বলে তারে, চুপিচুপি ডাকি।
কেন বাছা নতজানু, এ কথা নিশ্চিত—
বিষে তুমি হার মানো, মধুতে যে জিত।

গ্রন্থটি ইতিহাস, অতীত ও ভবিষ্যতে মধু ছড়াবে। গামা আবদুল কাদির, আপনি নিঃসঙ্গ কিন্তু একা নন। সেদিন আপনার অসুস্থ পত্নী, একমাত্র সন্তান—কেউই উপস্থিত থাকতে পারেননি, কিন্তু হাত বাড়িয়েছিল শত শত ভালোবাসা। দীর্ঘ হোক আপনার জীবন।