সিডনিতে নজরুল সন্ধ্যা: উজ্জ্বল ও রবিন গুডা’র কন্ঠে সুরের মূর্ছনা
আরিফুর রহমান:
গত ২৪ অক্টোবর শনিবার সন্ধ্যায় সিডনির হার্স্টভিল সিভিক সেন্টার যেন পরিণত হয়েছিল সুর, সৌন্দর্য আর আবেগের এক অনন্য মিলনমেলায়। অস্ট্রেলিয়াবাসী দুই নন্দিত শিল্পী নিজাম উদ্দিন উজ্জ্বল এবং ডোমিনিক রবিন গুডার সুরমূর্ছনায় আপ্লুত হয়েছেন হলভর্তি দর্শক ও শ্রোতা। বাংলাদেশের জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের গান নিয়ে অনন্য আয়োজন—‘সেলিব্রেটিং দ্য মিউজিক অব কাজী নজরুল ইসলাম’ ছিল সত্যি মনে রাখার মতো।
অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে আয়োজন করেছে সিডনি মিউজিক ক্লাব ও জলসা ইনক ক্যানবেরা। অনুষ্ঠানের পর্দা উঠেছে প্রথমেই ‘অরুণ-কান্তি কেগো যোগী ভিখারী’ গানটি পরিবেশনার মধ্য দিয়ে। শিল্পী নিজাম উদ্দিন ও রবিন গুডার যুগল কণ্ঠ হলভর্তি দর্শকদের যেন শান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়। শিল্পীরা এরপর একে একে ‘পিয়া পিয়া পাপিয়া পুকারে’, ‘নহে নহে প্রিয়’, ‘পদ্মার ঢেউ রে’, ‘বাগিচায় বুলবুলি’, ‘দাঁড়ালে দুয়ারে মোর’, ‘আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন’, ‘আমি পথ-মঞ্জরি ফুটেছি আঁধার রাতে’সহ নজরুলের অসংখ্য গান পরিবেশন করেন। ‘মনে পড়ে আজ সে কোন জনমে’ গানটি যুগল কণ্ঠে গাওয়ার মাধ্যমে অনুষ্ঠানের পর্দা নেমে আসে।
শিল্পীদের সঙ্গে বাদ্যযন্ত্রে সহযোগিতা করেন গুণী বাদ্যযন্ত্রশিল্পী সোহেল (গিটার), শাহরিয়ার (অক্টোপ্যাড), সোহান (কিবোর্ড), অভিজিৎ (তবলা), সাবিন (বাঁশি)। এছাড়া সাউন্ডের দায়িত্বে ছিলেন মিহির ও তপা। সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন শিখা, দীপা, নায়না।
অনুষ্ঠানের পরে দর্শক প্রতিক্রিয়ায় আমরা নিম্নলিখিত সুধীজনের মতামত গ্রহণ করেছি—
শাহীন শাহনেওয়াজ ( নাট্য নির্দেশক, অভিনেতা ):
নাফিসা আসিফ স্বাগতা (শিল্পী, সংগঠক):
শুনেছিলাম, নজরুলগীতি শোনার মতো আগ্রহী শ্রোতা এই শহরে খুব বেশি নেই। কিন্তু শনিবার সন্ধ্যায় Nizam Uddin ও Dominic Robin Guda পরিবেশিত নজরুলসংগীতের অনুষ্ঠানে সেই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হলো। শুধু আগ্রহী শ্রোতাই নন, সমঝদার শ্রোতাদের উপস্থিতিও অনুষ্ঠানটিকে করেছে সার্থক।
শুরু হলো আহির ভৈরবে বাঁধা “অরুণকান্তি কে গো” দিয়ে। সকালের রাগ হলেও সন্ধ্যায় এই গান দিয়েই উজ্জ্বল ও রবিনদা যেন অনুষ্ঠানের আবহ তৈরি করে দিলেন। একে একে দুজনের কণ্ঠে শুনলাম অসাধারণ কিছু গান। উজ্জ্বলের কণ্ঠে “পিয়া পিয়া পাপিয়া”, “নহে নহে প্রিয়”, “বুলবুলি নীরব নার্গিস বনে”, “শাওন রাতে যদি” এবং “আমার আপনার চেয়ে আপন” বিশেষভাবে মনে দাগ কেটে গেল। উজ্জ্বলের গান আমাদের সবসময়ই আনন্দ দেয়, এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এই শহরে বেসুরো বা তালে কাঁচা গানও তো শুনেছি, সেখানে শাস্ত্রীয় সংগীতে পারদর্শী উজ্জ্বলের পরিবেশনা যেন সজীবতা ও শুদ্ধতার প্রতীক। শেষমেশ এই অধমের অনুরোধে তিনি নজরুলের একটি কীর্তনও শোনালেন। ধন্য হলাম।
রবিনদা সিডনির শ্রোতাদের জন্য এক বিশেষ উপহার। কী মিষ্টি তাঁর কণ্ঠ, কী অসাধারণ সুরের দখল! “আমার কোন কূলে আজ” এবং একটি অপ্রচলিত শ্যামাসংগীত তিনি যে মাধুর্যে পরিবেশন করলেন, তা অনেক দিন মনে থাকবে। রবিনদার আরও অনেক গান শোনার অপেক্ষায় রইলাম।
আর এই অনবদ্য সন্ধ্যাটি আরও বিশেষ হয়ে রইল অসাধারণ কিছু যন্ত্রীদের কারণে। বন্ধু Abhijit Dan সেই তালিকায় নিঃসন্দেহে প্রথম সারিতে।
আল নোমান শামীম (কবি, সম্পাদক—মুক্তমঞ্চ):
উজ্জ্বল-রবীন দা’র “নজরুল সংগীতের আসরে” এক অদ্ভুত পরিবেশে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে কথা-সুর আর পরিবেশনায় আপ্লুত হয়েছি। সিডনিতে ক্লাসিক্যাল সংগীত শিল্পীদের মধ্যে সেরা সিরাজুস সালেকীন ভাই, রবীন দা আর উজ্জ্বল। উজ্জ্বলের খোলা গলার গানের ভক্ত আমি আর আমার স্ত্রী সাথী। আজ সেখানে রবীন দা’ও যুক্ত হলেন। এতো পরিনত মাধুর্য্যে মন্ডিত সন্ধ্যা-রাত অনেক সাধনার ফসল। শ্রোতারা এতোটাই মুগ্ধ হয়েছেন যে, বরাবরের মতো ‘লাইভ’ করার চেয়ে গান শুনতে শুনতে কখন যে তিন ঘন্টা পার করেছেন, কেউ টেরই পাননি। ধন্যবাদ উজ্জ্বল ও রবীন দাদা। সেই সাথে অপূর্ব বংশীবাদকের উদাসী সুর, আর অভিজিত দানের তবলা পুরোটাই অন্য এক ঐশ্বরিক জগতের দখিনা জানালা খুলে দিয়েছিলো। সোহেল ভাইয়ের সাথে অন্যান্য বাজিয়েদের মন ভালো করা আসরে থাকাটা ভীষন ভালো লাগার। অনেকদিন পর মন-আনন্দে নজরুল সংগীত শুনলাম।
কায়সার আহমেদ (লেখক, সংগঠক):
অনুষ্ঠানে দুই গুণী শিল্পীর কন্ঠে গান শুনে আপ্লুত হয়েছি। তারা যত গান শুনিয়েছেন সবই ছিলো হৃদয়গ্রাহী। তবে আমার দৃষ্টিতে তাঁর নজরুলের বিশাল গজল ভাণ্ডার থেকে তেমন বেশি গান করেননি। কেবল এটুকুই অপ্রাপ্তি থেকে গেলো। অবশ্য আমি অনুরোধও করিনি। তবে যেসব গান শুনেছি তাতেই আমি মুগ্ধ হয়েছি।
খালেদা কায়সার মিনি (সংগঠক):
নজরুল সন্ধ্যায় দুই শিল্পীর পরিবেশনা এত সুন্দর হয়েছিলো যে তাঁরা সারারাত গাইলে আমি সারারাত শুনতে পারবো। শত শত অনুষ্ঠানের ভীরে এই অনুষ্ঠানটি আমার বহুদিন মনে থাকবে। উজ্জ্বলের ‘ডায়েরির পাতা থেকে’ একক অনুষ্ঠান কিংবা জলসায় ওর পরিবেশনা আগেও দেখেছি কিন্তু শনিবারের সন্ধ্যায় যেনো আরেক দ্যুতি ভর করেছিলো তাঁর এবং রবিন গুডা’র কন্ঠে। আয়োজকদের অসংখ্য ধন্যবাদ এমন একটি সন্ধ্যার জন্য।
শিরীন হক (কাউন্সিলর, ক্যান্টারব্যুরি-ব্যাংক্সটাউন):
Hurstville Civic Centre এ ‘Songs of Nazrul’ সংগীতানুষ্ঠানে দারুণ একটি সন্ধ্যা কাটালাম। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী গান নিয়ে শিল্পী নিজাম উদ্দিন (উজ্জ্বল) ও রবিন গুদার পরিবেশনা সত্যিই মুগ্ধ করেছে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলা সংগীত ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে তুলে ধরার এমন সুন্দর আয়োজনের জন্য সিডনি মিউজিক ক্লাব ও জলসা ইনক. (ক্যানবেরা) কে আন্তরিক ধন্যবাদ ও অভিনন্দন। বাংলা গান ও সংস্কৃতির এই চর্চা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ুক।
সাকিনা আক্তার (শিল্পী, সংগঠক):
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সংগীত উদ্যাপন করতে অনেক সাহস, ভালোবাসা ও গভীর অনুরাগের প্রয়োজন। তিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে পরিচিত হলেও, প্রেমের প্রকাশে তাঁর যে অপূর্ব সৃষ্টিশীলতা, তা আমার আত্মাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। নিজাম উদ্দিন, রবিন গুডা, সোহেল খান ও অভিজিৎ দাঁ সহ সকলেই অসাধারণ। গান শুনে মন প্রাণ ভরে গেছে।
আবেদা রুচী (শিল্পী):
নজরুল সন্ধ্যায় পুরো অডিটোরিয়াম জুড়ে যাদু ছিলো। সুরের যাদু। ব্যাকগ্রাউন্ডের যাদু। যন্ত্রীদের যাদু। শিল্পীদ্বয়ের যাদু। সাউন্ডের যাদু। উজ্জ্বল, রবিন গুডা এন্ড টিম, হ্যাটস অফ এমন একটি দু:সাহসিক অথচ মুগ্ধতায় ভরা সংগীত যাত্রায় আমাদের সংগী করার জন্য।
তাজরিন ফারহানা ঐন্দ্রিলা:
কী অসাধারণ এক সন্ধ্যা! উজ্জ্বল ভাই ও রবিনদার পরিবেশনায় নজরুলগীতির মায়াবী উপস্থাপনা সত্যিই মুগ্ধ করেছে সবাইকে। দর্শক-শ্রোতারাও দারুণ উপভোগ করেছেন পুরো আয়োজন। আমার প্রিয় গানগুলো পরিবেশন করার জন্য এবং এমন একটি মনোমুগ্ধকর সংগীতসন্ধ্যা উপভোগ করার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য নিজাম উদ্দিন উজ্জ্বলকে বিশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।
আরিফুর রহমান (কথাসাহিত্যিক, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক—প্রশান্তিকা):
অনেকের মতো আমিও মন্ত্রমুগ্ধের মতো বসে শুনছিলাম এবং বারবার মনে হয়েছে এই দুই শিল্পীর গান কেবল কানে এসে পৌঁছায় না, হৃদয়ের গহিনে গিয়ে স্পর্শ করে। নিজাম উদ্দিন উজ্জ্বলের কণ্ঠ ও সুরের প্রতি আমার মুগ্ধতা নতুন নয়। জলসা কিংবা ডায়েরির পাতা থেকে পরপর তিন অনুষ্ঠানে তাঁর গান শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। কিন্তু এই নজরুল সন্ধ্যায় তাঁকে শুনতে শুনতে সেই মুগ্ধতা যেন আরও এক ধাপ গভীর হলো। তাঁর গায়কিতে রয়েছে একধরনের সহজাত সৌন্দর্য, যা কৃত্রিম আয়োজন দিয়ে তৈরি করা যায় না। সুরের প্রতি নিষ্ঠা, গানের কথার প্রতি মমত্ববোধ এবং পরিবেশনার ভেতরে অনুভূতির যে স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। সব মিলিয়ে তিনি শ্রোতাকে নিজের সঙ্গে নিয়ে চলেন। তাঁর গান শুনলে মনে হয়, তিনি শুধু সুরের চর্চা করেন না, গানের ভেতরকার অনুভূতিকেও ধারণ করেন।
আর শিল্পী রবিন গুডা’র পরিবেশনা এই প্রথম দেখলাম। তিনি অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরায় বসবাস করেন। জলসা ইনক ক্যানবেরা এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানে তিনি নিয়মিত গান করেন। সিডনিতে তাঁর নিজস্ব পরিবেশনায় সন্ধ্যাটিকে করে তুলেছিলেন আরও সমৃদ্ধ ও উপভোগ্য। দুই গুণী শিল্পীর পরিবেশনায় একের পর এক গান যেন খুলে দিচ্ছিল বাংলা সংগীতের একেকটি জানালা। কোথাও প্রেম, কোথাও বিরহ, কোথাও আত্মনিবেদন, আবার কোথাও জীবনের গভীর উপলব্ধি।




