রক্তে আঁকা ভোর—আনিসুল হকের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস । আতিকুর রহমান শুভ
'যারা ভোর এনেছিল’-এ ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমি যে বাড়াবাড়ি করেছিল, ‘রক্তে আঁকা ভোর’-এ সেটা একদম ছিল না। মূলত এই সিরিজে আমার প্রথম বইটিই শেষ পড়া। এরপর মাঝের বইগুলো আর পড়িনি ব্যাঙ্গমাদের বাড়াবাড়ির কথা চিন্তা করেই। এখন ভাবছি বাকি ৪টি বইও সংগ্রহ করতে হবে। হয়তো এত বড় একটা আখ্যানের প্রথম ভিত্তি হিসেবে আনিসুল হক ব্যাঙ্গমাদের প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। ‘রক্তে আঁকা ভোর’-এ কেবল যেখানে একটু তথ্যের দরকার বা ইতিহাসের একটা খোঁচা দরকার, সেখানেই তিনি চরিত্র দুটির মুখে বলিয়ে নিয়েছেন।
যেমন—২৫শে মার্চের কালো রাতের পরে দেশ ছাড়ার প্রাক্কালে স্ত্রী লিলিকে বলে আসতে পারেননি বঙ্গবন্ধুর ডানহাত খ্যাত তাজউদ্দিন আহমদ। তিনি সংগ্রাম পরিষদের ছেলেদের কাছে রেখে যাওয়া একটি চিরকুটে লিখলেন—
লিলি, আমি চলে গেলাম। আসার সময় কিছু বলে আসতে পারিনি। মাফ করে দিয়ো। আবার কবে দেখা হবে জানি না… মুক্তির পর। তুমি ছেলেমেয়ে নিয়ে সাড়ে সাত কোটি মানুষের সঙ্গে মিশে যেয়ো।
আরেকটি চিরকুট লিখলেন তাঁর সঙ্গী ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম। তখন পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগে, চিরকুট দুটি কি প্রাপকদের হাতে পৌঁছেছিল? ব্যাঙ্গমা বলে, ‘তাজউদ্দিনের চিরকুটটা পৌঁছাইছিল লিলির কাছে। আমীর-উল ইসলামের চিঠিটা লীলার কাছে পৌঁছায় নাই।’
অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে যখন লিলিসহ বাচ্চাদের সঙ্গে তাজউদ্দীনের দেখা হলো, সেটাও মনে রাখার মতো। তিনি স্ত্রীকে বললেন, “আমি প্রতিজ্ঞা করেছি। যত দিন দেশ শত্রুমুক্ত না হচ্ছে, তত দিন দাম্পত্য জীবন যাপন করব না।” তারপর তিনি মাত্র ৮ মিনিট পরে তাদের ছেড়ে চলে যান তাঁর জন্য নির্ধারিত থিয়েটার রোডের অফিস রুমের পাশের কক্ষের উদ্দেশে।
হাসিনা এসেছেন মায়ের কাছে। পেটে জয়। মা বললেন, মনটা রাখতে হয় ভালো। আর এর মধ্যে আল্লার গজব নেমে এসেছে। হাসিনা বললেন, ‘মা, আমি তোমাদের চিন্তাই করতাম। রাসেল সোনার চিন্তা করতাম। আব্বাকে নিয়ে তো চিন্তার শেষ নাই-ই। রাসেল, কাছে আসো। শার্ট খেয়ো না। আসো। তোমার জন্য চকলেট এনেছি তো!’
ইতিহাসের দায় আলাদা। তবে খুব স্বল্প পরিসরে যদি বলি, এই একটি বই পড়লেই ১৯৭১-১৯৭৫ পরিষ্কার হওয়া সম্ভব। শুধু পড়লেই হবে, মুখস্থ করার প্রয়োজন নেই। কেননা আনিসুল হক এমন ভাষায় লিখেছেন যে আপনাকে আর দ্বিতীয়বার পড়তে হবে না। বইটি মোট ১২৭টি অধ্যায়ে বিভক্ত। এই বিভক্তির কারণে পড়তেও সুবিধা।
পাকিস্তানের সৈন্যরা মওলানার খোঁজে চলে আসে বিন্যাফৈরে। তাঁর বাড়িতে ট্রেসার বুলেট বর্ষণ করে আগুন লাগিয়ে দেয়। গ্রামের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে তল্লাশি করতে থাকে, ‘কাফের মওলানা কিধার হ্যায়।’ প্রতিটা বাড়িতে তারা উন্মত্তের মতো আগুন দেয়। ভাসানীর দারাপুত্র-পরিবার আরও শত শত পরিবারের সঙ্গে নদীর বালুচরে আশ্রয় নেয়। খোলা আকাশের নিচে কাপড় বিছিয়ে পড়ে থাকে তারা।
মেহেরপুর আমতলায় স্বাধীন বাংলাদেশের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানটার যে আয়োজন হয়েছিল, সেটার বর্ণনা পড়ে একদিকে ভয়ের আশঙ্কা, অন্যদিকে যে শিহরণ জাগে তা অনেকদিন মনে থাকবে। শিহরণের জায়গাটা একটু পড়ুন—
“সৈয়দ নজরুল, তাজউদ্দীন আহমদ, কামারুজ্জামান, ক্যাপ্টেন মনসুর, মোশতাক, কর্নেল ওসমানী মঞ্চে এসে দাঁড়ালেন। মঞ্চের পাটাতনে মিশনারি গির্জা থেকে আনা কার্পেট। নিচে চকি। তার নিচে বাংলার মাটি… এই সময় সেন্টু, পিন্টু, আসাদুল, মনসুর হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইতে শুরু করলেনঃ
আমার সোনার বাংলা
আমি তোমায় ভালোবাসি
চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস আমার প্রাণে
ও মা, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি…”
ব্যাঙ্গমা বলবে, ‘এত সুন্দর কইরা, এত মায়া দিয়া “আমার সোনার বাংলা” আর কেউ কখনো গাইছে কি না, আমগো জানা নাই।’
খন্দকার মোশতাক কেবল ১৯৭৫-এ নয়, ১৯৭১-এও তিনি অন্য রাস্তার মানুষ ছিলেন। লেখকের ভাষায়—এই দূরত্ব ১৯৭৫ সালের আগস্টে কিংবা নভেম্বরে প্রকাশ পাবে তা নয়, এটা মুক্তিযুদ্ধকালেও স্পষ্ট হয়েছিল। সেটাও ১৯৭১-এর আগস্টেই। খন্দকার মোশতাক ছাড়া আরেকজন সেই ’৭১-এ যেমন ঝামেলা করেছেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও করেছেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মণি। কলকাতায় এক ঝটিকায় তিনি তাজউদ্দীনকে বলে দিলেন—“আপনি একজন অবৈধ প্রাইম মিনিস্টার। আপনার সরকার অবৈধ সরকার। আপনার সেনাপতি একজন অথর্ব। আপনাদের মানার প্রশ্নই আসে না।”
২৭৩ পৃষ্ঠায় ময়েজউদ্দীন বললেন, “কুমিল্লার পরিষদ সদস্যরা—মিজান চৌধুরী, মোশতাক, শাহ মোয়াজ্জেম, তাহের উদ্দীন ঠাকুর গং এক হয়েছে। তাজউদ্দীনকে সরাতে চায়। তাদের উসকানি দিচ্ছে শেখ মণি।”
পড়া একটু এগুলেই মনে হয়েছিল কিছু নোট নিই। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, নোট নিতে গেলে সেগুলো দিয়েই একটি ছোটখাটো উপন্যাসই হয়ে যেতে পারে। তারপর অনেকক্ষণ নোট নিলাম না। কিন্তু এই জায়গায় এসে থামতে হলো। ইন্দিরা গান্ধী এসেছেন মুক্তিবাহিনীর ট্রেনিং ক্যাম্পে। একজন কিশোরকে দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন—তোমার বয়স কত? ছেলেটি তাড়াতাড়ি তার বয়স বাড়িয়ে ফেলল তিন বছর। বলল, ১৮।
এখানে তোমার কষ্ট হচ্ছে না তো?
সে বলল, না, কষ্ট হচ্ছে না। কিসের কষ্ট! আমার বাড়ি পাকিস্তানি মিলিটারিরা পুড়িয়ে দিয়েছে। আমার বাবাকে মেরে ফেলেছে। আমি এখানে বেঁচে আছি…
ইন্দিরা গান্ধী আবেগাপ্লুত হলেন। এই ছেলেকে যে দেশ জন্ম দিতে পারে, সেই দেশ স্বাধীন হবেই।
জাতিসংঘে কলকাতা, লন্ডন ও আমেরিকা থেকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা গিয়েছেন। ইয়াহিয়া খানও পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করতে পাঠিয়েছেন কয়েকজন বাঙালিকে। রাজাকারগুলো হলো—শাহ আজিজুর রহমান, মাহমুদ আলী, রাজিয়া ফয়েজ। ১৬ ডিসেম্বরের পরে তাদেরকে জেলে ভরা হয়। ব্যাঙ্গমা বলবে, বীর উত্তম জেনারেল জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট হইয়া হ্যাগো মন্ত্রী বানান। শাহ আজিজ প্রধানমন্ত্রী, রাজিয়া ফয়েজ মহিলা মন্ত্রী। আরেক রাজাকার মশিউর রহমান যাদু মিয়াকে প্রথমে বানান হইছিল সিনিয়র মিনিস্টার। জিয়াউর রহমানের সমস্যাটা আছিল কি?
তাজউদ্দিন তাঁর কথা রেখেছিলেন। যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি স্ত্রী, পুত্র, কন্যাদের খোঁজ নেননি। ছেলেটির প্রচণ্ড জ্বরের সময় কিংবা ঈদের সময়েও তিনি যাননি। অথচ তারাও কলকাতায় এক ভাড়া বাসায়। বাংলাদেশ যেদিন স্বাধীন হয়েছিল, সেদিন পরিবারের সকলের সঙ্গে ভাত খেয়েছিলেন।
লন্ডন থেকে দিল্লি হয়ে সদ্য স্বাধীন দেশে ফিরছেন বঙ্গবন্ধু। “ব্রিটিশ স্টুয়ার্ড এসে জানালেন, বিমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ঢুকে গেছে। মুজিব জানালায় গিয়ে বসলেন। তিনি বাংলাদেশের রূপ দেখবেন। বললেন, বাংলাদেশের ওপর দিয়ে একটা চক্কর দিতে বলো। আমি দেশটাকে একবার ভালো করে দেখে নিই। তাই হলো। ৪৫ মিনিট ধরে চক্কর দিল বিমান। মুজিব আবৃত্তি করতে লাগলেন, নমো নমো নমো বাংলাদেশ মম চির মনোরম চির মধুর…”
‘রক্তে আঁকা ভোর’ শেষ হয়েছে মৃত্যুর দুয়ার থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসার একদিন পরে। শেষ হয়েছে অপেক্ষাকৃত একটি সুন্দর সকালের বর্ণনা দিয়ে। শেখ মুজিবের ঘুম ভেঙে গেলে তিনি দেখলেন ছোট্ট রাসেল তাঁকে গলা জড়িয়ে ধরে ঘুমোচ্ছে। আগের দিন সে তার আব্বাকে বলেছে—আর তোমাকে আমরা ছাড়ব না।
ভোরে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজে বসেছেন বেগম মুজিব। তারপর একে একে ঘরে আসবে রেহানা, শিশু জয়কে কোলে নিয়ে হাসিনা। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে হাসিনার আবদারে বঙ্গবন্ধু ছেলে হলে জয় নাম রেখে গিয়েছিলেন। আর বেগম মুজিব তাঁর স্বামীর নামের সঙ্গে মিল রেখে রেখেছিলেন সজীব—মুজিব-সজীব। হাসিনা জয়কে তার নানা ও খালার মাঝে শুইয়ে দেবেন। তারপর জয় হেসে উঠবে খিলখিল করে। তাঁর নানা বলবেন—ফেরেশতারা ওকে হাসাচ্ছে।
শেষ হলো আনিসুল হকের বৃহৎ আখ্যান, যা লিখতে তিনি ৬টি গ্রন্থ লিখে ফেলেছেন—যারা ভোর এনেছিল, উষার দুয়ারে, আলো-আঁধারের যাত্রী, এই পথে আলো জ্বেলে, এখানে থেমো না, রক্তে আঁকা ভোর। ৫৮৪ পৃষ্ঠার এই শেষ বইটি পড়ে আমি আনিস ভাইয়ের লেখা প্রথম উপন্যাস ‘ফাঁদ’ যেমন করে গ্লু’র মতো পড়েছিলাম, সেভাবেই শেষ করলাম। দুপুরের খাবার সন্ধ্যার দিকে খেয়েছি। বাড়ির লোকদের বলেছি ক্ষুধা লাগে নাই। গুরুত্বপূর্ণ-অগুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ পরিহার করেছি। মেয়ের আইসক্রিমের আবদারে বলেছি, এখনও শীত যায়নি, গলা বসে যাবে ইত্যাদি। শেষ করার পরে টানা তিনদিন ঘোরের মধ্যেই ছিলাম।
বঙ্গবন্ধুর নিজের লেখা তিনটি বই—‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’ এবং ‘আমার দেখা নয়াচীন’—যেমন রাজনীতি-চিন্তা বিশেষ না করে বাঙালি বা বাংলাদেশি মাত্র সকলের পড়া উচিত, তেমনি বঙ্গবন্ধুর জীবন ও আমাদের স্বাধীনতার সরল ইতিহাস, যা অধিকাংশ সময় মর্মস্পর্শী হয়ে উঠেছে, তার একটি সরল এবং মর্মস্পর্শী বয়ানের জন্য অবশ্যই আনিসুল হকের ‘রক্তে আঁকা ভোর’ পড়তে হবে। এটি অবশ্যপাঠ্য একটি বই। তাঁর ‘মা’ বইটির ১০০তম মুদ্রণ হয়েছে। অনবদ্য একটি গ্রন্থ। তবুও বলব—‘রক্তে আঁকা ভোর’ আনিসুল হকের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস।
আনিসুল হক কয়েকদিন আগে ফেসবুকের এক পোস্টে লিখেছেন, “একটা ন্যারেটিভ তৈরি হচ্ছিল, সংগ্রামকে যুদ্ধ বলবার, যেটা ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬—এমনকি ২০০৭ পর্যন্ত কায়েম ছিল। আমি সেটাকে চ্যালেঞ্জ করতে চেয়েছি। ব্যাখ্যাকারেরা এর ব্যাখ্যা করা ছেড়ে দিয়েছেন, কারণ তাতে গোপালগঞ্জের আদালতের কর্মচারী শেখ লুৎফর রহমানের পোলার কৃতিত্বের কথা এসে পড়ে। আমি তাত্ত্বিক নই, সৃজনশীল লেখক। আমার কাজ সৃষ্টি করা। আমি গল্প বলেছি—চরিত্র, সংলাপ, কর্ম, দৃশ্য, পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছি…”
আতিকুর রহমান শুভ: সম্পাদক, প্রশান্তিকা ।




