তুমি আমার অহংকার । অজয় দাশগুপ্ত

তুমি আমার অহংকার । অজয় দাশগুপ্ত
স্বাধীনতা মূলত: একটি স্পৃহা। যাকে পূর্ণ করে মানুষ আনন্দ আর স্বস্তি লাভ করে থাকে। সে কারণে আমদের দেশে একদা মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। আজ অনেকগুলো বছর পার হবার পর সেই স্পৃহার সামনে কতগুলো প্রশ্ন মাথা তুলে দাঁড়ি্য়েছে । যার উত্তর না খুঁজলে আমাদের স্বাধীনতা বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হতে থাকবে ।
প্রথমেই জানতে হবে ৫০ বছর পর স্বাধীনতা আসলে কি চায়? তার ও চাওয়া পাওয়া আছে। আছে বলেই তার রূপ পরিবর্তিত হতে থাকে। যাঁরা মুক্তিযোদ্ধা বা যুদ্ধে গিয়েছিলেন তাঁদের বয়স বেড়েছে । অনেকে পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিয়েছেন। তাঁরা কি তাঁদের ইস্পিত ও স্বপ্নের সেই দেশ দেখে যেতে পেরেছিলেন ? উত্তর অবশ্য ই না। এর কারণ অনেক। আজ যাঁরা সে প্রজন্মের প্রতিভু তাঁদের অনেকেই মনে করেন পথ বা মত পাল্টে গেছে। তাঁদের মত ও এখন ভিন্নমুখী । এটাকি অন্যায়? মৌলিকভাবে এর উত্তর হবে না। কিন্তু আমাদের ইতিহাস ও তার গতিপথ জানলে এক বাক্যে  এর উত্তর দেয়া অসম্ভব ।
আমরা যে দেশ বা সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলাম তার সাথে সাম্প্রদায়িকতা বা বিদ্বেষ যায় না। বিশেষত: ধর্ম বর্ণ আর জাতি ভেদ হবার কথাই ছিল না। মনে রাখতে হবে আমরা আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও চার জাতীয় নেতাকে যখন হারিয়েছি তখন এই দেশের বয়স মাত্র সাড়ে তিন বছর। এত অল্প বয়সে পিতাও অভিভাবকহিন একটা দেশ কোনদিকে যাবে বা যেতে পারে সেটা ভাবাও কঠিন। কিন্তু সৌভাগ্যের ব্যাপার এই এই দেশ এই মাটির একটা আলাদা ধরণের শক্তি আছে । যা ম্যাজিকের মতো। ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় ফুঁসে ওঠে এই শক্তির নাম চেতনা বা দেশপ্রেম । সেটি কখন কোথায় জাগবে কংবা কাজ করবে দুশমন নিজেও তা টের পায় না । টের পায় না বলেই বাংলাদেশ তার আপন মহিমায় সদা জাগ্রত ।
বহু পথ পেরিয়ে আজ আমরা যেখানে এসেছি সেখানে ইতিহাস অতীত আর ভবিষ্যত বহুবিধ সমস্যার সামনে দাঁড়িয়ে। বিশেষত: প্রজন্মের পর প্রজন্মে আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য এমনকি মূল চেতনা গ্যিরতর এক বিপন্নতার সমুখিন । এখন যে সংস্কৃতি বা প্রজন্মের এক বিশাল অংশ যেসব কর্মকান্ড করে চলেছে তাতে পুরানো মানুষ হিসেবে আমরা ভয় পেতেই পারি। যেমন ধরুন মাঝে মাঝে আমরা আমাদের পতাকা আর জাতীয় সঙ্গীতের বিরুদ্ধে কথা শুনি। তার অপমান বা তার বিরুদ্ধাচারণ দেখি। এগুলো কি কাম্য ছিল? ছিল না। কিন্তু এসব এখন আকছার ঘটছে। জাতীয় ইতিহাসের ভুল ভ্রান্তি আর অমনযোগের কারণে  এই দু:সাহস মাথা তুলতে পেরেছে । বিগত সরকার একটা লম্বা সময় দেশ শাসন করেছিল। সেই দীর্ঘ সময়ে তারা ইতিহাস ও অতীতকে যতটা বিজেদের করেছে বা করতে চেয়েছে ততটাই হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল । সেই কারণে হঠাৎ বিরোধিতা আর সবকিছু তছনছ করার প্রবণতা কেউ রুখতে পারে নি। ঐ যে বলছিলাম  অনেক অনেক বছর পর যখন মানুষ তার স্বপ্ন আর আশার বিপরীতে এসে দাঁড়ায় তখন নৈরাজ্য ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায় না ।

খুব ছোটখাটো মনে হলেও জরুরী হচ্ছে এগুলোর গভীরে যাওয়া। কেন এই তারুণ্য পাকিস্তানের গুণগানে বিভোর? কেন কাওয়ালী তাদের আরাধ্য ? কেন তারা মহফিল স্টাইলে টাকা ছুঁড়ে গান উদযাপন করতে চায় ? এসবের পেছনে কি শুধু ই ডিজিটাল জগত না কোন বিকৃতি ? ৫০ বছর আগে যখন মানুষ বাঙালি হবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল তার সেই ধারাবাঈকতায় ছেদ পড়লো কি ভাবে ? এর উত্তর গবেষণায় পাওয়া সম্ভব । কিন্তু খালি চোখে আমারা দেখি দীর্ঘ মেয়াদী একনায়কতন্ত্র সামরিক শাসন আর সমাজে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধিতার লালনেই তা বড় হয়ে উঠেছে । সামাজিক সংগঠন নাটক গান থিয়েটার বা শিল্পের গতি রুদ্ধ করলে সমাজ বিকলাঙ্গ হবেই। রুদ্ধতা যেমন তার দুশমন তেমনি তাকে ধরে বেঁধে স্তাবকতায় নিয়ে আসলেও এক ই ফল পেতে হবে। বিগত সময়ে সবকিছু দখল আর নিয়ন্ত্রণে না রাখালে মুক্ত করে আপন গতিতে চলতে দিলে বিরোধিতা থাকতো কিন্তু এই উগ্রতা থাকতো না।
খুব কাছের দিনগুলির কথা বলি। বিগত দেঢ় বছরে আমরা দেশের সব অর্জন ই মোটামুটি হাতছাড়া হতে দেখেছি। একটা সময় এমন মনে হচ্ছিল যে এই দেশের নাম বা পরিচয় ও ঘুচে যাবে । যারা দেশের ভেতর আতংক আর অস্থিরতায় দিনযাপন করছিলেন তারা জানেন এটা কতটা ভয়াবহ।  হঠাৎ করে বিরোধিতার নামে সবকিছু মুছে দেয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় দেশের প্রাণ ভোমরা সংবিধান ও প্রায় হাতছাড়া হবার মতো হয়ে গেছিল। একজন নোবেল বিজয়ী ও তার হিংসার কবলে পড়া দেশ না কি রিসেট বাটনের চাপে পিছিয়ে যাবে । তিনি খুব আস্থা আর দু:সাহস নিয়ে বলতেন, রিসেট বাটন চিপে দিছি। কাজেই ওগুলো সব মুছে গেছে।
আমরা ভয়ার্ত হলেও মনে মনে জানতাম এটা অসম্ভব। একজন মানুষের হৃদপিন্ড চালু রেখে তার শরীরকে অবশ করা যায় না। বাংলাদেশকেও মুক্তিযুদ্ধ বা অতীত মুছে অবশ করা যাবে না । ভাগ্য ভালো সেটা হয় নি। কেন হয় নি?
ঐ যে কথায় বলে অন্ধকার যত তীব্র হোক না কেন একটি মোমবাতিই পারে ঘন অন্ধকারে পথ দেখাতে । সে অন্ধকার বা তিমির বিনাশী আলোর নাম ইতিহাস । এ কথা বললে তো হবে না যে একাত্তর মিথ্যা। এ কথা বললেই ইতিহাস মানবে না যে মুক্তিযুদ্ধে ভারত বাংলাদেশ আর অন্যান্য সহযোগীরা মিলে দেশ স্বাধীন করে নি। সত্য আতর আপন আলোয় উদ্ভাসিত এক দীপ। সেই দীপের আলো জ্বালিয়ে রাখা সাধারণ মানুষেরা একটু সুযোগ মিলতেই তাদের মনের কথার জানান দিয়ে দিয়েছেন ।
সহজ কথা এই, বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্বাধীনতার মতো কোন পরিবেশে বা পরিস্থিতিতে পা রাখে নি। হ্যাঁ তার বুকে চেপে থাকা দু:শাসন বা লুটপাটের জবাব সে দিয়েছে এবং দেবে। তার সাথে স্বাধীনতা মুক্তিযুদ্ধ কিংবা বঙ্গবন্ধুর সম্পর্ক ছিল না। দেশ শাসনে যে ভুল করবে সে তার জবাব পাবেই। তাকে নির্মমভাবে বিদায় নিতে হলে নেবে । কিন্তু সে জম্য একাত্তর আমাদের গণহত্যার কালিমা ঘুচে যাবে না । মলিন হবে  না স্বাধীনতার জয় জয়াকার। বহু কষ্ট ত্যাগ আর ইজ্জত সম্মানের বিনিময়ে সাড়ে সাত কোটি মানুষ এ দেশ পেয়েছিল। যে দেশের নেতা দেশে ফিরে অশ্রু সিক্ত নয়ানে বলেছিলেন: কবিগুরু দেখে যাও তোমার বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে ।
ভুল ভ্রান্তি আর ইতিহাস থেকে পাঠ নিয়ে ঘুরে দা২ড়ানোর নাম বাংলাদেশ । তার স্বাধীনতা আর মুক্তিযুদ্ধকে কেউ কেড়ে নিতে পারবে না । স্বাধীনতা দিবসে এটাই যেন সত্য মানি আমরা।
২৪ মার্চ ২০২৬, সিডনি।