সেই রাত্রির নক্ষত্রালোকিত নিবিড় বাতাস । মুহাম্মদ শাওয়াব

সেই রাত্রির নক্ষত্রালোকিত নিবিড় বাতাস । মুহাম্মদ শাওয়াব

ধরা যাক, আপনি একজন লেখক। বিশেষত্বহীন কোনো মধ্যরাতে হাঁটছেন আনমনে। বিষাদগ্রস্তও কিছুটা। হয়তো হয়নি বনিবনা প্রেমিকার সাথে কিংবা মিলছে না আপনাদের জীবনবোধ। যদিও জীবনবোধ একই হতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এমতাবস্থায়, একদল মাতালের গাড়ি থামল আপনার সামনে। তুলে নিতে চায় আপনাকে। আপনিও করলেন না আপত্তি, চড়ে বসলেন এক পুরনো মডেলের গাড়িতে।

এটুকু স্বাভাবিক। ঘটতেই পারে। তারা আপনাকে নিয়ে যেতেই পারে শহরের বিখ্যাত কোনো শুড়িখানায়। আপাদমস্তক ডুবাতেও পারে কোনো তুমুল আগ্নেয় তরলে। সাথে থাকতেও পারে পছন্দের স্ন্যাক্স এবং আপনিও উগড়ে দিতে পারেন সমস্ত গোপন। আমেরিকান লেখক গিলের সাথে অকস্মাৎ ঘটে যায় এমন কিছুই।

পৃথিবীর সুন্দরতম বৃষ্টিগুলোর একটা হয় প্যারিসে, এ তো সকলেরই জানা। লেখক গিল সে বৃষ্টিতে ভিজতে চাইলে তাতে বাধা দেয় ভবিষ্যৎ স্ত্রী ইনেজ— যার কাছে প্যারিস কেবল ট্র্যাফিক জ্যামে পূর্ণ পুরনো এক শহর। একদিন ইনেজের সাথে অভিমান করেই হোটেল থেকে নেশায় চুরচুর অবস্থায় বের হয়ে যায় গিল। নেশায় চুরচুর অবস্থায় গিল যখন হাঁটছিল উদ্দেশ্যহীন, একসময় আবিষ্কার করে সে হারিয়ে ফেলেছে হোটেলে ফেরার পথ। ক্লান্ত গিল বসে পড়ে চার্চের সিঁড়িতে। আচমকা একদল অতীতের লোক পুরনো মডেলের গাড়িতে করে তুলে নিতে চায় তাকে, মোহাচ্ছন্ন হয়ে সানন্দে উঠে পড়ে গাড়িতে।

বাংলা ভাষায় এখন লিখতে এসেছে এমন অনেকের সাথেই কথা হয়েছে আমার। তাদের একটা বড় অংশই বলেন, সুযোগ পেলে জন্মাতেন কয়েক দশক আগে। ঘোরগ্রস্ত হয়ে পড়েছে যাদের লেখা, সেসব লেখকদের সাথে আড্ডায় মেতে থাকলে পারলে কেমন হতো জীবন— এইসব স্বপ্নালু ভাবনায় মেতে থেকে নিজেদের সময়কে বর্তমানের অনেকে মনে করেন অনুর্বর। হতাশায় বুঁদ হয়ে থেকেও বর্তমান থেকে পালিয়ে অতীতের ফ্যান্টাসিতে ডুবে থাকে কেউ কেউ। তেমনিভাবে, গিল মনে করে ওঁর জন্য সবচেয়ে মোক্ষম সময় ১৯২০-এর প্যারিস। তখন প্যারিস মুখরিত ছিল বিশ্বসেরা সাহিত্যিক, সঙ্গীতজ্ঞ ও চিত্রকরদের আনাগোনায়। ‘মিডনাইট ইন প্যারিস’ দেখতে বসলে মনে হয় না আমরা কোনো সিনেমা দেখছি; মনে হয়, ভুল করে ঢুকে পড়েছি বহুদিনের পুরনো কোনো স্বপ্নের ভেতর। সেখানে সময় সরলরৈখিক নয়। মধ্যরাত নামলেই খুলে যায় এক অদ্ভুত দরজা। আর সেই দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ে মানুষ নিজের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষাগুলোর কাছে।

সেই পুরনো মডেলের পিজো গাড়ি গিলকে নিয়ে যায় স্বপ্নের দশকে। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, পাবলো পিকাসো ও তাঁর প্রেমিকা আদ্রিয়ানা, কোল পোর্টার, সালভাদর দালি, লুই বুনয়েল, টি. এস. এলিয়টের মতো শিল্পী; যারা গিলের স্বপ্নের প্যারিসের বাসিন্দা— তাদের মোহময়তায় জড়িয়ে পড়ে গিল। অতীতের প্যারিসের বাসিন্দাদের সাথে কেটে যায় একাধিক ঘোরগ্রস্ত, কল্পনাতীত রাত। হেমিংওয়ের সাথে বসে গিল আলোচনা করে সাহিত্য, মৃত্যু ও প্রেম নিয়ে। দালি তার স্বভাবসিদ্ধ উন্মাদ চোখে বাস্তবতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। বুনয়েল এমনসব চলচ্চিত্রের ধারণা নিয়ে কথা বলে, যেগুলো নির্মিত হয়নি তখনও। আর গিল— যে কিনা নিজের সময়ের কাছে খানিক ব্যর্থ, বেমানান ও ক্লান্ত— হঠাৎ করেই আবিষ্কার করতে থাকে, সে প্রবেশ করেছে নিজের বহুদিনের কল্পিত আশ্রয়ে। কিন্তু আশ্রয় বলে যা-কিছু, তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। গিল ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করে, যাদের সে কল্পনা করত দেবতার মতো, তারাও ছিল অসুখী। তারাও ভাবত, তারা ভুল সময়ে জন্মেছে। আদ্রিয়ানা বিশ্বাস করে, প্রকৃত স্বর্ণযুগ ছিল আরো পেছনে। সেখানে গিয়েও দেখা যায়, সেই সময়ের শিল্পীরাও আবার রেনেসাঁকে মনে করত মানবসভ্যতার শ্রেষ্ঠ সময়। মানুষ কখনোই নিজের বর্তমানকে ভালোবাসতে পারে না যেন; সবসময়ই মনে হয়, ভীষণ সৌন্দর্য ঘটে গেছে অন্য কোথাও, অন্য কোনো যুগে।

এই জায়গাতেই এসে ‘মিডনাইট ইন প্যারিস’ কেবল টাইম ট্রাভেলের চলচ্চিত্র থাকে না, হয়ে ওঠে মানুষের চিরকালীন মানসিক পলায়নের গল্প। আমরা প্রায়ই নিজেদের সময়কে ব্যর্থ ভাবি, কারণ এই সময়ের ধুলোবালি, বাজারদর, রাজনৈতিক ক্লান্তি, সম্পর্কের ভাঙাচোরা ও দৈনন্দিন যন্ত্রণা আমাদের খুব কাছ থেকে স্পর্শ করে; অথচ অতীতকে দেখি নান্দনিক দূরত্ব থেকে। সেখানে কেবল জ্যাজ বাজে, নামে বৃষ্টি, একদল আর্টিস্ট আড্ডা দেয় জনাকীর্ণ-নির্জন ক্যাফেতে বসে।

উডি অ্যালেন অত্যন্ত কোমল অথচ নির্মমভাবে দেখান, মানুষ মূলত স্মৃতির প্রতি নয়, স্মৃতির অলঙ্করণের প্রতি আসক্ত। আমরা অতীতকে যেমন ছিল তেমনভাবে মনে রাখি না; বরং যেভাবে মনে রাখতে চাই, সেভাবেই নির্মাণ করি। গিলের মতো আমরাও মাঝেমধ্যে কল্পনা করি, অন্য কোনো শহরে, অন্য কোনো সময়ে, অন্য কিছু মানুষের সঙ্গে থাকলে হয়তো আরো খানিকটা সুন্দর হতো জীবন…

‘মিডনাইট ইন প্যারিস’ শেষ পর্যন্ত হতাশার গল্প নয়, বর্তমানকে পুনরাবিষ্কারের গল্প। গিল শেষে বুঝতে পারে, যে মানুষ বর্তমানকে ধারণ করতে পারে না, সে কোনো যুগেই পারবে না সুখী হতে। এখানে হয়তো সৃষ্টি হয় আরেকটি প্রণয়গাঁথা। হয়তো ঘোর কাটে, হয়তো কাটে না। সিনেমার দৈর্ঘ্য ফুরিয়ে যায়। আর আমরা জানতে পারি, প্রত্যেকের বর্তমানই তার ‘গোল্ডেন টাইম’। সব শহরেই থাকে স্মৃতির মতো গন্ধ।

মুহাম্মদ শাওয়াব: জন্ম— ২০০৮ সালের ২৬ মার্চ। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেছেন যথাক্রমে সিরাজগঞ্জের বি.এল. সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও ঢাকার সেন্ট যোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে। বর্তমানে পড়াশোনা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে।

ই-মেইল: moohammadshawab@gmai.com