সিডনিতে ‘সুরের খেয়ায় স্বর্ণালী সন্ধ্যা’: রুমানা ফেরদৌস লনীর পরিবেশনায় মুখরিত লিভারপুল পাওয়ারহাউস
প্রশান্তিকা ডেস্ক : সিডনির Liverpool Powerhouse-এ শনিবার সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হলো বাংলা সংগীত ও সংস্কৃতির বিশেষ আয়োজন ‘সুরের খেয়ায় স্বর্ণালী সন্ধ্যা—An Evening of Golden Melodies’। Delta Vision T/A Delta TV Australia Inc.আয়োজিত এ সংগীতসন্ধ্যার কেন্দ্রীয় শিল্পী ছিলেন বাংলাদেশি-অস্ট্রেলিয়ান সংগীতশিল্পী রুমানা ফেরদৌস লনী। রবীন্দ্রসংগীত, আধুনিক বাংলা গান, লোকগান, দ্বৈত পরিবেশনা, বাংলা-হিন্দি ফিউশন, নৃত্য এবং সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির সমন্বয়ে অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে সিডনির বহুসাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বাংলা সংগীত ও সংস্কৃতির এক বর্ণিল উদ্যাপন।
সন্ধ্যার মূল সংগীতপর্ব শুরু হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ধায় যেন মোর সকল ভালোবাসা’ দিয়ে। লনীর কণ্ঠে গভীর আত্মনিবেদন ও প্রার্থনাময় আবহের এই পরিবেশনা শুরুতেই দর্শক-শ্রোতাদের নিয়ে যায় এক ভিন্ন অনুভূতির জগতে। এরপর ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে, ওগো বিদেশিনী’ পরিবেশনের আগে নাটকীয় উপস্থাপনা অনুষ্ঠানে যোগ করে ভিন্ন মাত্রা। বাগানের আদলে সাজানো মঞ্চ ও বেঞ্চকে ঘিরে কথোপকথনের মাধ্যমে গানটির পটভূমি এবং রবীন্দ্রনাথের জীবনে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সঙ্গে পরবর্তী সময়ের সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়। উল্লেখ্য, গানটি রবীন্দ্রনাথ ১৮৯৫ সালে শিলাইদহে রচনা করেন এবং এর ‘বিদেশিনী’ ঠিক কে ছিলেন তা আজও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
এরপর ‘বধূ কোন আলো লাগলো চোখে’ পরিবেশিত হয় সংগীত ও নৃত্যের সমন্বয়ে। কণ্ঠ, নৃত্য, আলো এবং মঞ্চ-অভিব্যক্তির সম্মিলিত উপস্থাপনা দর্শকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। পুরো অনুষ্ঠানে মঞ্চসজ্জা, আলোক পরিকল্পনা, সাউন্ড এবং অডিও-ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনাকে গানের আবহের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাজানো হয়।
বাংলা গানের বৈচিত্র্যময় যাত্রা
অনুষ্ঠানে রুমানা ফেরদৌস লনীর কণ্ঠে একে একে পরিবেশিত হয় বিভিন্ন সময়ের জনপ্রিয় বাংলা গান। ‘আমার এ দুটি চোখ’, ‘যেতে দাও আমায় ডেকো না’, ‘সন্ধ্যাবেলা তুমি আমি বসে আছি দুজনে’, ‘তুমি না হয় রহিতে কাছে’, ‘ও পলাশ ও শিমুল’, ‘একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়’, ‘এই মন তোমাকে দিলাম’, ‘তখন তোমার একুশ বছর’, ‘তোমার কাছে ফাগুন চেয়েছে কৃষ্ণচূড়া’ এবং **‘কী দিলে আমায় তুমি’**সহ বিভিন্ন পরিবেশনা কখনও দর্শকদের নিয়ে যায় স্মৃতি ও নস্টালজিয়ায়, কখনও প্রেম, প্রকৃতি ও শিকড়ের টানে।
একক পরিবেশনার পাশাপাশি দ্বৈত ও ফিউশন গানও ছিল সন্ধ্যার অন্যতম আকর্ষণ। অমিত দেওয়ান পরিবেশন করেন মেসবাহ আহমেদের ‘আবার দেখা হলে’। লনী ও সাদিক রেহমানির পরিবেশনায় বাংলা-হিন্দি ফিউশন এবং ‘Tumse Milke’ অনুষ্ঠানে ভিন্ন স্বাদ যোগ করে। লনী ও অমিতের দ্বৈত পরিবেশনা ‘আগে যদি জানতাম’-ও দর্শকদের সাড়া পায়।
অনুষ্ঠানের শেষভাগে পরিবেশনা আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। ‘আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম আমার ঠিকানা’, ব্যান্ড পরিবেশনা ‘রূপালি গিটার’ এবং লোকসুরের জনপ্রিয় ‘বন্ধে মায়া লাগাইছে’ দিয়ে অনুষ্ঠান এগিয়ে যায় উৎসবমুখর সমাপ্তির দিকে।
লনীর সঙ্গে মঞ্চে যন্ত্রসংগীতে সহযোগিতা করেন অভিজিৎ দান, দেবজানি গুহ, সাবিন ঘিসিং, অমিত দেওয়ান, সাদিক রেহমানি, আবুহাদি, জয়েশ দেওয়ান ও আহসানুর রহমানসহ সংগীতদলের সদস্যরা। শিল্পী ও মিউজিশিয়ানদের সম্মিলিত পরিবেশনা পুরো সংগীতসন্ধ্যাকেপ্রাণবন্ত করে তোলে।
সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি ও সম্মাননা
অনুষ্ঠানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল Cultural Acknowledgement & Recognition Awards। প্রবাসে সংস্কৃতিচর্চা, সৃজনশীল কর্মকাণ্ড, কমিউনিটি সংগঠন, বাংলা সংগীতের প্রসার এবং বহুসাংস্কৃতিক সম্প্রীতিতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্যক্তি ও সংগঠনকে বিশেষ সম্মাননা জানানো হয়।
Sirajus Salekin-কে Singer, Cultural Organiser এবং Founder, Protitee হিসেবে তাঁর সাংস্কৃতিক অবদানের জন্য সম্মানিত করা হয়। Shaheen Shahnewaz-কে Drama Artist ও Creative Directorহিসেবে নাট্য ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। Shadat Hossain-কে Community Organiser—Event & Cultureহিসেবে কমিউনিটি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর ভূমিকার জন্য সম্মাননা জানানো হয়।
বাংলা সংগীতকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরার উদ্যোগের স্বীকৃতিস্বরূপ Listen For – Bangladesh Nights-কে “Musical Event Organiser | Elevating Bangla Music to the World Stage”সম্মাননা দেওয়া হয়। একইভাবে Rupanty Akid-কে Actress | Modelএবং Laurence Barrel-কে Creative & Performing Artist হিসেবে তাঁদের সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি জানানো হয়।
বিশেষভাবে Mayor – Liverpool City Council-কে “Multicultural Harmony & Community Support”-এর জন্য সম্মাননা জানানো হয়। Liverpool-এর বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর মধ্যে বহুসাংস্কৃতিক সম্প্রীতি এবং কমিউনিটি কার্যক্রমে সহযোগিতার স্বীকৃতি হিসেবেই এই সম্মাননা প্রদান করা হয়।
Liverpool Mayor Ned Mannoun পূর্বনির্ধারিত ব্যস্ততার কারণেঅনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে না পারায় তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে CouncillorFiona Macnaught অনুষ্ঠানে যোগ দেন। Mayor-এর পক্ষ থেকেআয়োজকদের প্রতি শুভেচ্ছা জানানো হয়। তাঁর উপস্থিতি স্থানীয়সরকার ও বহুসাংস্কৃতিক কমিউনিটির মধ্যকার সহযোগিতার গুরুত্বকেআরও দৃশ্যমান করে তোলে।অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডেল্টা ভিশনেরসভাপতি সাজ্জাদ সিদ্দিকি ।
সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সফল আয়োজন
বড় পরিসরের এই আয়োজনের নেপথ্যে ছিল শিল্পী, মিউজিশিয়ান, কারিগরি দল, স্বেচ্ছাসেবক, স্পনসর, পার্টনার ও কমিউনিটি সদস্যদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। অনুষ্ঠানে সহযোগী sponsors, partners ও supporters-দের বিশেষভাবে স্বীকৃতি ও কৃতজ্ঞতা জানানো হয়।
Chattogram University Alumni Association Australia (CUAA)-এর সদস্যরা অনুষ্ঠানস্থলে Reception, Ticket Check-in এবং Food Service ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিশেষভাবে Masud, Tamal, Rumi, Babu, Akhter ও Shagor-এর আন্তরিক সহযোগিতা, পরিশ্রম ও সমন্বয় দর্শকসেবা এবং অনুষ্ঠান পরিচালনাকে আরও সুশৃঙ্খল করতে সহায়তা করে।
শিল্পী ও মিউজিশিয়ানদের পাশাপাশি সাউন্ড, লাইটিং, অডিও-ভিজ্যুয়াল, মঞ্চ ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য কারিগরি কাজে যুক্ত সদস্যদের অবদানও ছিল আয়োজনটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, একাধিক রিহার্সাল এবং অনুষ্ঠানদিনে বিভিন্ন দলের সমন্বিত কাজের মধ্য দিয়ে আয়োজনটি সম্পন্ন হয়।
আয়োজক Delta Vision T/A Delta TV Australia Inc. শিল্পী, মিউজিশিয়ান, নৃত্যশিল্পী, সম্মানিত অতিথি, সম্মাননাপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও সংগঠন, স্পনসর, পার্টনার, স্বেচ্ছাসেবক, কারিগরি দল এবং উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
আয়োজকদের মতে, ‘সুরের খেয়ায় স্বর্ণালী সন্ধ্যা’ শুধু একটি সংগীতানুষ্ঠান আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর অন্যতম উদ্দেশ্য প্রবাসে বাংলা সংগীত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তুলে ধরা, নতুন প্রজন্মের সঙ্গে শিকড়ের সংযোগ তৈরি করা এবং অস্ট্রেলিয়ার বহুসাংস্কৃতিক সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক বিনিময়কে আরও দৃঢ় করা।
সিডনির বুকে বাংলা গান, নৃত্য, মঞ্চশিল্প, সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি এবং কমিউনিটির সম্মিলিত অংশগ্রহণে ‘সুরের খেয়ায় স্বর্ণালী সন্ধ্যা’ তাই হয়ে উঠেছিল সংগীতের পাশাপাশি সংস্কৃতি, বন্ধন ও বহুসাংস্কৃতিক সম্প্রীতির এক মিলনমেলা।




