কারার ঐ লৌহকপাটের ওপারে ডিজেরিডুর সুর । শাখাওয়াৎ নয়ন

কারার ঐ লৌহকপাটের ওপারে ডিজেরিডুর সুর । শাখাওয়াৎ নয়ন

উডনাইট কনসার্টের সবচেয়ে আলোচিত ও সাহসী মুহূর্ত আসে কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ পরিবেশনার সময়। এই গানটি ইম্প্রোভাইজ করতে গিয়ে অস্কারজয়ী সংগীত পরিচালক এ আর রহমান চরম সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। তা সত্ত্বেও অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে এহসান আহমেদ একই গানে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র ডিজেরিডু (Didgeridoo) ব্যবহার করেছেন। সংগীততাত্ত্বিক দিক থেকে এটি একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত, কারণ ডিজেরিডুর ড্রোন-ভিত্তিক নিম্ন ফ্রিকোয়েন্সি সহজেই মূল সুরকে ঢেকে ফেলতে পারে। কিন্তু এহসান আহমেদ এখানে ডিজেরিডুকে ব্যবহার করেছেন একটি টেক্সচারাল লেয়ার হিসেবে, প্রধান মেলোডির প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়। ডিজেরিডুর গভীর ড্রোন ‘কারার ঐ লৌহকপাট’-এর বন্দিত্ব ও দ্রোহের আবহকে এক নতুন সোনিক মেটাফোর দিয়েছে। বাংলা গানে এ ধরনের ক্রস-কালচারাল ইন্সট্রুমেন্টেশন আগে শোনা যায়নি, এবং এখানেই এই পরিবেশনাটি আলাদা গুরুত্ব দাবি করে।

উল্লেখ্য, অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের ইতিহাস কেবল একটি জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের ইতিহাস নয়; এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করা এক গভীর intergenerational trauma-এর কথাও বলে। উপনিবেশিক দখল, ভূমি থেকে উৎখাত, ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর নিষেধাজ্ঞা, স্টোলেন জেনারেশন (জোরপূর্বক শিশুদের নিয়ে যাওয়া)—এসবকিছু মিলিয়ে আদিবাসী সমাজে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে যে ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা সময়ের সঙ্গে মুছে যায়নি; বরং স্মৃতি হয়ে, সুর হয়ে, নিঃশ্বাস হয়ে আজও বহমান। এই ট্রমার বিপরীতে তাদের সংগীত ও বাদ্যযন্ত্র—বিশেষ করে ডিজেরিডু—হয়ে উঠেছে দৃঢ়তর এক দ্রোহের ভাষা। এটি কেবল একটি যন্ত্র নয়; এটি ভূমির সঙ্গে সম্পর্ক, পূর্বপুরুষের স্মৃতি এবং টিকে থাকার ঘোষণাপত্র। তাই ‘কারার ঐ লৌহকপাট’-এর মতো বিদ্রোহী গানের সঙ্গে ডিজেরিডুর সংযোগ একটি নিছক সংগীত-পরীক্ষা নয়; এটি দুই ভিন্ন ভূগোলের বন্দিত্ব, প্রতিরোধ ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষার এক শক্তিশালী সাংস্কৃতিক সংলাপ।

এই প্রতীকী ও সাংস্কৃতিক উচ্চতার ভেতরেই অনুষ্ঠিত হয়েছে “গানপোকা” আয়োজিত “উডনাইট” লাইভ কনসার্ট। সিডনির সংগীতাঙ্গনে এহসান আহমেদ নতুন কোনো আগন্তুক নন। কিন্তু মঞ্চে উঠলেই তিনি নতুন এক রূপে ধরা দেন। এই পুনর্জন্মই একজন অভিজ্ঞ শিল্পীর সবচেয়ে বড় অর্জন। “উডনাইট” তারই আরেকটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ, যেখানে শিল্পী, ব্যান্ড এবং দর্শক—এই ত্রিমাত্রিক সম্পর্কটি এক অনন্য সংগীতভাষায় মিলিত হয়েছে।

কনসার্টের সূচনা হয় হিন্দি চলচ্চিত্র সংগীতের কালজয়ী ক্লাসিক “লাগ যা গালে” দিয়ে। এখানে এহসান আহমেদের কণ্ঠে লক্ষ্য করা যায় একটি নিয়ন্ত্রিত mezza voce প্রয়োগ, যেখানে ভলিউম নয়, বরং emotive phrasing এবং breath control প্রধান ভূমিকা রাখে। গানটির অন্তরায় তিনি যে মাইক্রো-ডাইনামিক্স ব্যবহার করেছেন, তা মূল কম্পোজিশনের আবেগ অক্ষুণ্ন রেখেই ব্যক্তিগত মুন্সিয়ানা যোগ করেছে। এই ধরনের সূক্ষ্মতা সাধারণত ক্লাসিক্যাল ট্রেনিং ও দীর্ঘ লাইভ পারফরম্যান্স অভিজ্ঞতা ছাড়া অর্জন করা কঠিন।

এরপরই তিনি সুরের ভুবন ঘুরিয়ে নিয়ে যান বাংলার মাটিতে—“আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি”। এই গানটিতে তাঁর কণ্ঠে শোনা যায় ফোক টোনালিটি ও সেমি-ক্ল্যাসিক্যাল অলংকরণের এক সুন্দর সংমিশ্রণ। এখানে ‘গমক’ ও ‘আন্দোলন’ খুব সচেতনভাবে ব্যবহৃত হয়েছে—অতিরিক্ত নয়, আবার কমও নয়। ব্যান্ডের অ্যাকুস্টিক অ্যারেঞ্জমেন্ট গানটির লিরিক্যাল ন্যারেটিভকে সামনে এনে দিয়েছে, যেখানে গিটার খুব সংযতভাবে স্পেস তৈরি করেছে।

কনসার্টের বড় শক্তি ছিল এর কিউরেটেড প্লেলিস্ট। স্প্যানিশ গান থেকে শুরু করে বলিউড, হলিউড, টালিউড এবং ঢালিউড—গত প্রায় ৬০ বছরের জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের গান তিনি পরিবেশন করেছেন। এই বহুভাষিক ও বহু-জঁনরার রিপার্টুয়ারে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং বিষয় হলো স্টাইলিস্টিক অথেনটিসিটি বজায় রাখা। স্প্যানিশ গানে তাঁর রিদমিক আর্টিকুলেশন ও সিনকোপেশন যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য, আবার বলিউড ও ঢালিউড গানে ফিরে এলে তিনি সহজেই উপমহাদেশীয় মেলোডিক সেন্সিবিলিটিতে ফিরে আসেন। এটি একজন বহুমাত্রিক ভোকালিস্টের পরিচয় বহন করে।

হাউজফুল প্রায় ৫০০ দর্শকের সামনে এহসান আহমেদের স্টেজ প্রেজেন্স ছিল আত্মবিশ্বাসী কিন্তু অহংবর্জিত। তিনি কেবল গান গাইছেন না, বরং অডিয়েন্স এনগেজমেন্টকে পারফরম্যান্সের অংশ করে তুলেছেন। কোথাও কল অ্যান্ড রেসপন্স, কোথাও আবার পরিচিত রিফ্রেনে দর্শকদের কণ্ঠ মিশিয়ে দেওয়া—সব মিলিয়ে কনসার্টটি হয়ে ওঠে একটি shared musical experience।

ব্যান্ডের ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য। ড্রামস, বেস, কিবোর্ড ও গিটারের টাইট অ্যারেঞ্জমেন্ট এবং ক্লিন মিক্সিং কণ্ঠকে কখনোই ঢেকে দেয়নি। বরং প্রতিটি যন্ত্র কণ্ঠের জন্য জায়গা করে দিয়েছে—যা একটি সফল লাইভ কনসার্টের মৌলিক শর্ত।

সব মিলিয়ে “উডনাইট” কেবল একটি গান শোনার আয়োজন ছিল না; এটি ছিল স্মৃতি, নস্টালজিয়া, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং আধুনিক মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির ভাষায় বলতেই হয়—এটি একটি well-produced live musical narrative। আমাদের শহরের গানওয়ালা এহসান আহমেদ আবারও প্রমাণ করলেন, ভালো শিল্পীরা সত্যিই “হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা”—তাঁদের সুরের পেছনে মানুষ আপনাতেই হাঁটে।