সিডনির বাঙালি নারী যখন ডেপুটি মেয়র ও অন্য প্রসঙ্গ । অজয় দাশগুপ্ত

সিডনির বাঙালি নারী যখন ডেপুটি মেয়র ও অন্য প্রসঙ্গ । অজয় দাশগুপ্ত

মূলত দুটি পজিটিভ নিউজ বা সংবাদ নিয়ে আজকের লেখা। আমাদের পরিচিত বাঙালি মেয়ে এলিজা আজাদ রহমান টুম্পা। অনেকদিন থেকেই তাকে চিনি। ছিপছিপে গড়নের এলিজা শাড়ি পরে, টিপ দেয়, চমৎকার বাংলার সাথে ভালো ইংরেজি বলতে পারে। কিছুদিন আগে সে এখানকার স্থানীয় নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে জয়ী হয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। তাক লাগানোর মূল কারণগুলোর একটি ছিল, সে যেসব মানুষের ভোটে জিতেছে তাদের মধ্যে বহু ভাষাভাষী আর শ্বেতাঙ্গ মানুষের সংখ্যাই বেশি। অর্থাৎ কেবল বাংলাদেশি ভোট ব্যাংক বা উপমহাদেশের পরিচিত মানুষদের ভোট তাকে জয়ী করেনি। তখনই ভাবছিলাম যে এই মেয়েটি কিছু একটা করবে।

এই ক’দিন আগে টুম্পা অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশিদের আবারও তাক লাগিয়ে প্রথম নারী ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত হয়েছে। এ আমাদের অহংকার। টুম্পা বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ আর অসাম্প্রদায়িক ঘরানার প্রতিনিধি। যারা আমরা দেশের রাজনীতি, দল, মত নিয়ে পড়ে থাকি, নিয়ত সেগুলো নিয়ে তর্ক-বিবাদে লিপ্ত হই, টুম্পা তাদের সাথে থেকেও নিজেকে আলাদা করে নিয়েছে।

দেশের পটপরিবর্তন ও মুক্তিযুদ্ধ বা প্রগতিশীলতার ওপর হামলার পর ওর চোখে জল দেখেছি আমি। প্রগতিশীল ও বাংলার রাজনীতি রক্তে ধারণ করা টুম্পা এক ইতিহাস গড়েছে। এর আগে আমাদের বাঙালিদের পুরুষ কয়েকজন এই পদে আসীন ছিলেন। কিন্তু এবার প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কোনো নারী ডেপুটি মেয়র হলেন। এই বিজয় একদিকে যেমন আন্তর্জাতিকতা ও বহুজাতিকতার বিজয়, অন্যদিকে বাঙালির জয়।

নানা কারণে আমরা ভুলে যাই বা ভুলিয়ে দেওয়া হয়, আমাদের নারীরা কত শক্তিশালী। বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থা এবং দেশ শাসনে দুই নারীর দীর্ঘ মেয়াদ, সময় সময় জাহানারা ইমাম বা সুফিয়া কামালের মতো নারীরা এসে দাঁড়িয়েছিলেন। বহুকাল আগে এই বঙ্গদেশে বেগম রোকেয়া বা প্রীতিলতার মতো সাহসী নারীর আবির্ভাব আমাদের মনে রাখতে হবে। তাঁরা আমাদের আলোর দিশারী। সে পথ হয়তো কোনো না কোনোভাবে আজকের নারীদেরও আকর্ষণ করে। করে বলেই টুম্পার মতো মেয়েরা ঘর সামলে বাইরে পা রেখেছে।

 এই দেশে আপনি রাজনীতি করেন বা যাই করেন, আপনাকে রুটি-রোজগারের জন্য আরও কিছু করতে হয়। ঘর সামাল দিতে হয়, সেই ঘর যেখানে কোনো গৃহকর্মী নেই। সূচ থেকে সুতা, সব কাজ, সবকিছু করার পর এমন একটা কাজের সাফল্য মনে করিয়ে দেয়, মেয়েরা দশভূজা। তারা একসাথে অনেক কিছু সামলাতে পারে। আজ যে ডেপুটি মেয়র, সে একদিন মেয়র হবে, তারপর এমপি হবে—এমন ভরসা আমরা রাখতেই পারি। সিডনিতে আমাদের দেশ ও সমাজের মুখ উজ্জ্বল করা এলিজা আজাদ রহমান টুম্পা, তোমাকে অভিনন্দন।

দ্বিতীয় প্রসঙ্গটি মিডিয়া সংক্রান্ত। সিডনির হার্স্টভিল সিভিক থিয়েটারে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ৭ সেপ্টেম্বর সোমবার ঢাকা সিডনি ইনসাইডারের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতি, বহুসাংস্কৃতিক সমাজ, কমিউনিটি নেতৃত্ব, আইন, শিক্ষা, ব্যবসা ও গণমাধ্যমের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানের মূল আলোচনার বিষয় ছিল—“গণমাধ্যমের গুরুত্ব: তথ্য প্রদান, সংযোগ স্থাপন এবং বহুসাংস্কৃতিক সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ করা।”

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন মাল্টিকালচারালিজম (বহুসংস্কৃতিবাদ)-এর সংসদীয় সচিব মার্ক বুটিগিগ এমএলসি। বিশেষ অতিথি ছিলেন সাবেক সহকারী প্রেসিডেন্ট, এনএসডব্লিউ পার্লামেন্ট শওকত মোসলমানি, ডেপুটি মেয়র মাসুদ চৌধুরী, কাউন্সিলর এলিজা রহমান, কাউন্সিলর মাসুদ খলিল ও সাবেক কাউন্সিলর শাহে জামান টিটু।

বক্তব্য রাখেন কমিউনিটি নেতা গামা আব্দুল কাদের, একুশে একাডেমির সভাপতি সুলতান মাহমুদ, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অস্ট্রেলিয়ার সভাপতি মনিরুল হক জর্জ, কমিউনিটি নেতা শফিকুল আলম, বিশিষ্ট কলামিস্ট অজয় দাসগুপ্ত, শাখাওয়াত নয়ন, কমিউনিটি নেতা ফজলুল হক সফিক, গ্রেস ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী পরিচালক সিমরিতা খাডকার, বিশিষ্ট আইনজীবী রাজ দত্ত।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা সিডনি ইনসাইডারের সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি ড. মো. সিরাজুল হক। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রধান সম্পাদক আজাদ কবির। অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করে বক্তব্য রাখেন নির্বাহী সম্পাদক রহমত উল্লাহ।

অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের মধ্য থেকে বক্তব্য রাখেন মুক্তমঞ্চের সম্পাদক মো. নোমান শামীম, সিডনি বাংলা নিউজের সম্পাদক মিজানুর রহমান সুমন, অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশ টেলিভিশন রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি অর্ক হাসান, স্বদেশ বার্তার সম্পাদক ফয়সল আজাদ, বাংলাদেশ মিডিয়া ফোরাম অস্ট্রেলিয়ার সভাপতি হুমায়ুন কবির রোজ প্রমুখ।

এটি তাদের সংবাদ। কিন্তু আমার বলার কথা ভিন্ন। কাজী নজরুল ইসলাম বহুকাল আগে দুঃখ করে বলেছিলেন, বাংলায় পত্র-পত্রিকার অপমৃত্যু শিশু মৃত্যুর হারের চেয়েও বেশি। এখনো সে ধারা চলমান। সেদিনের সফল সন্ধ্যায় আমি প্রশ্ন রেখেছি, এই মিডিয়া কি বাংলা বাঙালির ঠিকানা হয়ে উঠবে? এই সিডনিতে বেশ কিছু বাংলা পোর্টাল চালু আছে। একসময় মুদ্রিত কাগজগুলো এখন উধাও। আমার জানা মতে, স্বদেশ বার্তা নামে প্রকাশিত প্রথম যে পত্রিকা, তার আয়ু ছিল দীর্ঘ। কিন্তু সময় তাকে তুলে নিয়েছে। স্মরণ করি এর প্রকাশক-সম্পাদক প্রয়াত নূরুল আজাদকে। সাথে এটাও বলি, সময়ের চাহিদা আর গতি বুঝতে হবে।

আজকাল ডিজিটাল যুগে মানুষজন নিজেরাই এক একটি মাধ্যম। তাদের হাতের মোবাইল ক্যামেরা। তাদের হাতের নাগালে অবারিত সামাজিক মিডিয়া। চাইলেই ভালো-মন্দ যা কিছু লেখা যায়। কিন্তু সবচাইতে বড় কথা বিশ্বাস আর ভালোবাসা অর্জন। সে ভালোবাসা বা বিশ্বাস কী সামাজিক মিডিয়ার আছে? বেশির ভাগ জায়গায় তা থাকে না। তাই উপকার যত করে, তার অধিক সন্দেহ আর অবিশ্বাস তৈরি করে সামাজিক মিডিয়া। যেমন ধরুন, এ লেখা যখন লিখছি, তখন আমাদের প্রিয়, আমার অনুজ বন্ধু, এক সাংবাদিক-লেখক লাইফ সাপোর্টে। তার লাইফ সাপোর্ট খুলে নেওয়ার কথা আছে। কিন্তু অধৈর্য সময়ের মানুষজনের কি সবুর করার সময় আছে? তারা ইতোমধ্যে তাকে মেরে ফেলেছে। দেশে-বিদেশে যত ঘটনা ঘটে, তার বেশির ভাগই উপস্থাপিত হয় রং মাখিয়ে। তাই মানুষ বিশ্বাসের পরিবর্তে সন্দেহপ্রবণ হয়ে উঠেছে। এবং তা অন্যায্য কিছু নয়।

বিদেশে এখন মিডিয়া করা যত সহজ, তাকে টিকিয়ে রাখা ততটাই কঠিন। দেশেও একই হাল। এমন বাস্তবতায় এই নতুন মিডিয়াটি কতটা এগুবে, কতটা সামনে যাবে—তার বিচারক সময়। কিন্তু ধন্যবাদ আর অভিনন্দন তাদের প্রাপ্য। এখনো মানুষ খবর পড়ে, খবর দেখে আর বিশ্বাস করতে চায়।

ঢাকা সিডনি ইনসাইডার দীর্ঘজীবী হোক। অভিনন্দন।