তারাশঙ্করের ‘কবি’: জীবন এত ছোটো কেনে । রবিশঙ্কর মৈত্রী

তারাশঙ্করের ‘কবি’: জীবন এত ছোটো কেনে । রবিশঙ্কর মৈত্রী

কিছু উপন্যাস পড়া যায়। কিছু উপন্যাস পড়ার পরও অনেকদিন আমাদের ভিতরে পড়তে থাকে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কবি’ তেমনই একটি উপন্যাস।

বইটি বন্ধ করার পর কাহিনি শেষ হয়, কিন্তু নিতাই শেষ হয় না। তার গান থামে না। তার আকাঙ্ক্ষা, তার প্রেম, তার না-পাওয়া, তার একাকিত্ব—কোনো কিছুই বইয়ের শেষ পাতায় গিয়ে থেমে থাকে না। বরং সেখান থেকেই তারা আমাদের ভিতরে প্রবেশ করে। কখনও মনে হয়, নিতাই যেন একজন মানুষ নয়—একটি দীর্ঘশ্বাসের নাম। আর সেই দীর্ঘশ্বাসের ভিতর থেকে বারবার ভেসে আসে—জীবন এত ছোটো কেনে।

এই একটি প্রশ্নের মধ্যে যেন ‘কবি’র সমস্ত বেদনা এসে জমা হয়।

জীবন এত ছোটো কেন?

মানুষ যখন পৃথিবীকে চিনতে শুরু করে, তখন তার হাতে সময় কমে আসে। যখন ভালোবাসার অর্থ বুঝতে শেখে, তখন অনেক প্রিয় মানুষ দূরে সরে যায়। যখন নিজের ভিতরের গানটি শুনতে পায়, তখন জীবনের সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে।

মানুষ যেন সারাজীবন প্রস্তুতি নেয় বাঁচার জন্য—অথচ বাঁচার সময়টুকুই সবচেয়ে কম।

নিতাইয়ের জীবনেও সেই নির্মম পরিহাস। সে কবি। কিন্তু কবি হওয়ার আগে সে মানুষ। তারও শরীর আছে, ক্ষুধা আছে, কামনা আছে, স্বপ্ন আছে, অভিমান আছে। তারও ইচ্ছে করে কারও কাছে বসতে, কারও চোখের ভিতর নিজের জন্য একটু জায়গা খুঁজে নিতে, কারও হাতের উষ্ণতায় নিজের সমস্ত ক্লান্তি ভুলে যেতে।

কিন্তু মানুষের জীবন কি তার ইচ্ছেমতো লেখা হয়?

হয় না।

তারাশঙ্করের ‘কবি’র সৌন্দর্য এখানেই যে, তিনি নিতাইকে কোনো আদর্শায়িত কবির আসনে বসাননি। তিনি তাকে মাটির মানুষ করে রেখেছেন। সে ভুল করে, আকাঙ্ক্ষা করে, দুর্বল হয়, ভালোবাসে, হেরে যায়। আর সেই হারার ভিতর দিয়েই তার কবিতা জন্ম নেয়।

কবিতা এখানে সৌন্দর্যের অলংকার নয়; কবিতা হচ্ছে বেঁচে থাকার ক্ষতচিহ্ন।

নিতাইয়ের যে কথাগুলো বলা হয়ে ওঠে না, সেগুলোই তার গানে আশ্রয় নেয়। যে ভালোবাসা তার জীবনে সম্পূর্ণতা পায় না, সেটিই তার ভিতরে আরও গভীর হয়ে ওঠে। যে মানুষকে সে কাছে পায় না, সেই মানুষই তার কল্পনার আকাশে চিরকাল থেকে যায়।

এখানে এসে ‘কবি’র সেই চাঁদের উপমাটি আমাকে থামিয়ে দেয়—

চাঁদ তুমি দূরে থাকো,
আমি তোমায় দেখব খালি।

কী অদ্ভুত ভালোবাসা! কাছে পাওয়ার দাবি নেই। স্পর্শ করার আকাঙ্ক্ষাও যেন ধীরে ধীরে সরে গেছে। শুধু দূরে থেকো—আমি তোমাকে দেখব।

সম্ভবত ভালোবাসার সবচেয়ে পরিণত অবস্থাগুলোর একটি এই—যেখানে অধিকার মুছে যায়, থেকে যায় শুধু উপস্থিতির আকাঙ্ক্ষা।

তুমি আমার নও—তবু তুমি আছো।

এই ‘আছো’টুকুই যথেষ্ট।

চাঁদকে কেউ ছুঁতে পারে না। অথচ পৃথিবীর কত মানুষ চাঁদের দিকে তাকিয়ে নিজের একাকিত্বের সঙ্গে কথা বলে! চাঁদ তাদের কাছে কোনো গ্রহ-উপগ্রহ নয়; চাঁদ হয়ে ওঠে দূরের প্রিয়জন, অসম্ভব স্বপ্ন, হারিয়ে যাওয়া যৌবন, কিংবা এমন কোনো সুখ যার কাছে যাওয়া আর সম্ভব নয়।

নিতাইয়ের চাঁদও তেমন। সে জানে—সব পাওয়া যায় না। কিন্তু না-পাওয়ার অর্থ এই নয় যে ভালোবাসাও শেষ হয়ে যায়।

বরং কখনও কখনও অপ্রাপ্তিই ভালোবাসাকে দীর্ঘজীবী করে। এই জায়গায় এসে ‘কবি’ শুধু প্রেমের উপন্যাস থাকে না। এটি হয়ে ওঠে মানুষের অস্তিত্বের উপন্যাস।

আমরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে নিতাই।

আমাদেরও কিছু চাঁদ আছে—যাদের আমরা ছুঁতে পারিনি। কিছু নদী আছে—যার ওপারে যেতে পারিনি। কিছু মানুষ আছে—যাদের কাছে দাঁড়িয়ে থেকেও কথা বলা হয়নি। কিছু দরজা আছে—যেগুলো আমাদের জন্য আর কখনও খোলেনি।

কিন্তু আশ্চর্য, সেই না-পাওয়াগুলোই আমাদের স্মৃতির সবচেয়ে উজ্জ্বল অংশ হয়ে থাকে।

জীবনে যা পেয়েছি, তার অনেকটাই একদিন সাধারণ হয়ে যায়।

যা পাইনি, তা থেকে যায়। একটি অসমাপ্ত চিঠি।
একটি অপ্রকাশিত বাক্য। একটি বিদায়ের মুহূর্ত। একটি মুখ। একটি বিকেল।

তারাশঙ্কর সেই অসমাপ্তির লেখক। তিনি জানেন, মানুষের জীবনকে শুধু অর্জনের গল্প দিয়ে বোঝা যায় না। মানুষের ভিতরের আসল ইতিহাস লেখা থাকে তার অপ্রাপ্তির অভিধানে।

নিতাইয়ের কবিতা সেই অভিধানেরই ভাষা।

আর নিতাইকে ঘিরে যে লোকজ জগৎ—কবিগান, আসর, গান, মাটি, মানুষ, গ্রামীণ জীবন—তা ‘কবি’কে আরও এক অনন্য মাত্রা দিয়েছে। তারাশঙ্কর সেই পৃথিবীকে বাইরে থেকে দেখেননি। তিনি মানুষের হাসির ভিতরের দুঃখ দেখেছেন, উৎসবের ভিতরের শূন্যতা দেখেছেন, গানের ভিতরের কান্না শুনেছেন।

কবির গ্রাম কোনো পোস্টকার্ডের বাংলা নয়। এখানে মাটির গন্ধ আছে, ঘামের গন্ধ আছে, অভাব আছে, মানুষের স্বপ্ন আছে। আছে শরীরী আকাঙ্ক্ষা, আছে সামাজিক সীমাবদ্ধতা, আছে শ্রেণি ও জীবনের কঠিন বাস্তবতা।

আর তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একজন কবি।

সে যেন মাটির মানুষ হয়েও মাটির সীমা ছাড়িয়ে যেতে চায়। তার ভিতরে একটা আকাশ আছে। এই আকাশটাই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। কিন্তু কবির সবচেয়ে বড় অভিশাপও হয়তো এটাই—সে পৃথিবীকে শুধু দেখে না, অনুভব করে। অন্য মানুষ যেখানে একটি বিচ্ছেদ দেখে, কবি সেখানে একটি শূন্যতা অনুভব করে।

অন্য মানুষ যেখানে একটি সন্ধ্যা দেখে, কবি সেখানে জীবনের ক্ষয় দেখতে পায়। যেখানে একটি মুখ দেখে, কবি সেখানে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখতে পায়। কবির আনন্দও গভীর, তার দুঃখও গভীর।

নিতাইয়ের ভিতরের কবি তার আশ্রয়, আবার তার যন্ত্রণা। সে যত বেশি অনুভব করে, তত বেশি আহত হয়।

তবু সে গান থামায় না। না-থামাটিই ‘কবি’র সবচেয়ে বড় মানবিক শিক্ষা।

জীবন তাকে পূর্ণতা দেয়নি—তবু সে জীবনকে প্রত্যাখ্যান করেনি।

প্রেম তাকে সবটুকু দেয়নি—তবু সে ভালোবাসতে অস্বীকার করেনি।

সমাজ তাকে সবসময় বুঝতে পারেনি—তবু সে নিজের কণ্ঠকে চুপ করায়নি। এখানেই নিতাইয়ের মহত্ত্ব। সে জয়ী নয়, কিন্তু পরাজিতও নয়। মানুষ সবসময় যা অর্জন করে তার জন্য বড় হয় না; কখনও কখনও সে যে বেদনা বহন করে, তার মধ্য দিয়েও বড় হয়ে ওঠে।

‘কবি’ তাই আমাকে বারবার ফিরিয়ে নিয়ে যায় মানুষের সেই চিরন্তন প্রশ্নের কাছে—

আমরা কেন ভালোবাসি, যখন জানি হারাব?

আমরা কেন স্বপ্ন দেখি, যখন জানি সব স্বপ্ন পূর্ণ হবে না?

আমরা কেন গান গাই, যখন জানি একদিন আমাদের কণ্ঠ থেমে যাবে?

হয়তো উত্তরটি খুব সহজ। মানুষ অসম্পূর্ণ হয়েও সম্পূর্ণতার স্বপ্ন দেখতে পারে। মানুষ ক্ষণস্থায়ী হয়েও অনন্তকে ভালোবাসতে পারে।

মানুষ জানে তার জীবন ছোটো—তবু সে চাঁদের দিকে তাকায়। এখানেই কবিতার জন্ম। এখানেই মানুষের জন্ম। আর এইখানেই ‘কবি’র নিতাই আমাদের আপন হয়ে ওঠে।

বইটি পড়তে পড়তে একসময় মনে হয়—নিতাইয়ের গল্প নয়, আসলে আমারই গল্প পড়ছি। আপনার, আমার, আমাদের প্রত্যেকের গল্প। যে জীবন থেকে কিছু মানুষ চলে গেছে, কিছু স্বপ্ন ঝরে গেছে, কিছু কথা বলা হয়নি—তবু আমরা বেঁচে আছি।

বেঁচে আছি বলে আবার ভালোবাসছি।

আবার কোনো সন্ধ্যায় আকাশের দিকে তাকাচ্ছি। আবার কোনো পুরোনো গান শুনে হঠাৎ থেমে যাচ্ছি। আবার মনে পড়ছে কাউকে।

আর মনে হচ্ছে—জীবন এত ছোটো কেনে!

তারাশঙ্কর কোনো উত্তর দেন না। হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায় না। জীবন ছোটো বলেই ভালোবাসা এত মূল্যবান। হয়তো সময় সীমিত বলেই একটি মুহূর্ত অনন্ত হয়ে ওঠে। হয়তো মানুষ একদিন চলে যায় বলেই তার গাওয়া গান থেকে যায়।

নিতাইও থেকে যায়। তার শরীরের বাইরে, তার জীবনের বাইরে, তার ব্যক্তিগত দুঃখের বাইরে—সে থেকে যায় একটি কণ্ঠস্বর হয়ে।

দূরের চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকা একটি কণ্ঠস্বর। যে জানে, চাঁদকে পাওয়া যাবে না। তবু বলে—দূরে থাকো। আমি তোমাকে দেখব। এই দেখাটুকুই তার ভালোবাসা। ভালোবাসাটুকুই তার কবিতা। আর এই কবিতাটুকুই তার অমরত্ব।

‘কবি’ আমার কাছে শুধু তারাশঙ্করের একটি উপন্যাস নয়, মানুষের অপূর্ণতার প্রতি এক গভীর প্রণাম। যে মানুষটি সব পায়নি, তাকে প্রণাম। যে প্রেম পূর্ণ হয়নি, তাকে প্রণাম।

যে স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত স্বপ্নই রয়ে গেছে, তাকে প্রণাম। আর সেই কবিকে প্রণাম, যে জীবনের কাছে বারবার হেরে গিয়েও শেষ পর্যন্ত গানকে হারতে দেয়নি।

জীবন সত্যিই ছোটো।

কিন্তু একটি সত্যিকারের গান—

একটি সত্যিকারের ভালোবাসা—

একটি সত্যিকারের কবিতা—

মানুষের ছোট্ট জীবনকে অতিক্রম করে অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারে। হয়তো চাঁদের কাছাকাছি পর্যন্ত।

 

রবিশঙ্কর মৈত্রী : কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, আবৃত্তিকার। লেখালেখির বাইরে ব্যস্ত রয়েছেন নান্দনিক প্ল্যাটফর্ম ‘সহজ মানুষ’ নিয়ে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ ও দেশের বাইরে কৃতী বাঙালিদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন বৃহৎ পরিবার।

প্রকাশিত গ্রন্থ ৮১টি। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘আমি আগন্তুক’। এছাড়া বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য- একলা সুখের শূন্য দুপুর; এই বইটি আবৃত্তির; আবৃত্তি ভাবনা; প্রমিত উচ্চারণ অভিধান; যাও কিছু রেখে যেয়ো না; প্যারিস থেকে ফেরা না ফেরা; যিশু হলেই ক্রুশবিদ্ধ হতে হয়; খোলা জানালা বন্ধ আকাশ; মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু ইত্যাদি।

বসবাস- আলেস, ফ্রান্স।