বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণযুগ । আরিফুর রহমান
( সিডনিতে ২০২৬ সালের SAFALFEST ( South Asian Film Arts and Literature Festival) বাংলাদেশী ডায়াসপোরা লেখক হিসেবে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন কথাসাহিত্যিক আরিফুর রহমান। প্যানেলিস্ট হিসেবে তিনি ‘Golden Era Of Bengali Literature’ নামে একটি নিবন্ধ উপস্থাপন করেন। আরিফুর রহমান জানিয়েছেন- লেখাটি প্রস্তুত করা হয়েছে অবাঙালি পাঠক ও দর্শকদের জন্য, সেজন্যে কেবল মোটাদাগে শুধু প্রখ্যাত বাঙালি লেখক ও কবিদের কথা বলা হয়েছে। প্রশান্তিকার পাঠকদের জন্য নিবন্ধটি বাংলায় অনুবাদ করে প্রকাশ করা হলো।)
শুভ অপরাহ্ন। সম্মানিত সঞ্চালকবৃন্দ, বিশিষ্ট অতিথিবৃন্দ এবং প্রিয় বন্ধুগণ—
আমার নাম আরিফুর রহমান। আমি বাংলা ভাষায় লিখি। আমি বাংলাতেই সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি, তাই ইংরেজিতে আমার সব অনুভূতি ও ভাবনা নিখুঁতভাবে প্রকাশ করা হয়তো সবসময় সহজ হবে না। তবুও আজ আমি আমার অনুভূতি ও চিন্তাগুলো আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।
প্রথমেই, আমাকে এখানে কথা বলার সুযোগ দেওয়ার জন্য SAFALFEST কমিটির আয়োজকদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। এই আলোচনার অংশ হতে পারা সত্যিই আমার জন্য অনেক বড় সম্মানের।
আমরা যখন বাংলা সাহিত্যের “স্বর্ণযুগ” নিয়ে কথা বলি, তখন এমন একটি অসাধারণ সময়কে বুঝি, যখন বাংলা সাহিত্য গভীরতা, সৌন্দর্য এবং মননশীলতার এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল। অধিকাংশ গবেষকের মতে, এই সময়কাল উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিক পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি ছিল সামাজিক জাগরণ, রাজনৈতিক পরিবর্তন, সাংস্কৃতিক নবজাগরণ এবং নতুন চিন্তার উত্থানের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়।
সে সময় সাহিত্য কেবল বিনোদনের জন্য রচিত হয়নি। লেখকেরা সাহিত্যকে সমাজের দর্পণ এবং মানবতার কণ্ঠস্বর হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁদের লেখায় উঠে এসেছে প্রেম, বেদনা, দারিদ্র্য, অবিচার, নারীর অধিকার, সামাজিক বৈষম্য, আধ্যাত্মিকতা এবং মানবিক মর্যাদার কথা। সাহিত্য মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে উঠেছিল, এবং সাধারণ মানুষ নিজেদের আনন্দ-বেদনা এসব লেখার মধ্যে খুঁজে পেয়েছিল।
সাহিত্য ও জীবনের এই গভীর সংযোগ গড়ে উঠেছিল কিছু অসাধারণ সাহিত্যিক ও কবির হাতে, যাঁদের অবদান আজও প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে।
প্রথমেই আমাদের উল্লেখ করতে হবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম। আপনারা অনেকেই জানেন, তিনি ভারত ও বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত রচনা করেছেন। এছাড়াও ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয় যে, তাঁর সাহিত্য ও সংগীতের প্রভাব শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীত রচনাতেও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল, কারণ এটির রূপকারের সঙ্গে তাঁর প্রতিষ্ঠান- শান্তিনিকেতনের সম্পর্ক ছিল। রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যে এনে দিয়েছেন অনন্য সৌন্দর্য, মানবতা ও দার্শনিক গভীরতা। তাঁর কবিতা, গান, উপন্যাস ও ছোটগল্পে তিনি প্রেম, প্রকৃতি, স্বাধীনতা, আধ্যাত্মিকতা এবং মানবমনের নানা দিক তুলে ধরেছেন। তিনি বাংলা সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দেন এবং সাহিত্যে প্রথম অ-ইউরোপীয় নোবেলজয়ী হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন।
আরেকজন মহীরুহ ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, যিনি আধুনিক বাংলা উপন্যাসের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচিত। তাঁর লেখনী দেশপ্রেম, জাতীয় চেতনা এবং সামাজিক সংস্কারের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। তাঁর বিখ্যাত গান “বন্দে মাতরম” পরবর্তীতে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকে পরিণত হয়।
আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে। তাঁর উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে বহু জনপ্রিয় চলচ্চিত্র, যেমন দেবদাস ও পরিণীতা। আমার মনে হয় এখানে উপস্থিত অনেকেই শরৎচন্দ্রকে না চিনলেও এই সিনেমা দু’টি অনেকেই দেখেছেন। শরৎচন্দ্র সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারী, দরিদ্র ও সমাজের নিপীড়িত মানুষের কথা লিখেছেন। তাঁর সহজ অথচ আবেগময় গল্প বলার ভঙ্গি গভীর মানবিকতা ও সততার সঙ্গে বাঙালি সমাজের বাস্তবতা তুলে ধরেছে।
কাজী নজরুল ইসলাম—বিদ্রোহী কবি এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি। তাঁর কবিতা সাহস, প্রতিবাদ এবং ন্যায়ের প্রতি অঙ্গীকারে ভরপুর ছিল। তিনি শোষণ, সাম্প্রদায়িকতা, বৈষম্য ও ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লিখেছেন এবং মানুষকে স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদার জন্য সংগ্রামে অনুপ্রাণিত করেছেন। বিশেষ করে তাঁর বিদ্রোহী কবিতা বাংলা এবং বাংলার বাইরে বহুভাবে মানুষকে অনুপ্রেরণা জাগিয়েছে।
আমাদের অবশ্যই জীবনানন্দ দাশের কথাও বলতে হবে, যিনি বাংলা কবিতায় গভীর আধুনিকতা ও অন্তর্মুখী ভাবনার নতুন ধারা নিয়ে আসেন। তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে প্রকৃতি, নিঃসঙ্গতা, স্মৃতি, সময় এবং অস্তিত্বের অনুভূতি। আজ তিনি বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধুনিক কবি হিসেবে বিবেচিত।
সর্বশেষে বলতে হয় মাইকেল মধুসূদন দত্তের কথা। তিনি নতুন সাহিত্যরীতি, নাটকীয় ভঙ্গি এবং সাহসী ভাষাগত পরীক্ষার মাধ্যমে বাংলা কবিতা ও নাটকে এক বিপ্লব ঘটান। তাঁর অবদান বাংলা সাহিত্যকে নতুন পথে এগিয়ে দেয়।
বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধি এখানেই থেমে থাকেনি। বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে শেষভাগ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, সমরেশ মজুমদার, শংকরসহ আরও অনেক লেখকের হাতে বাংলা সাহিত্য আরেকটি অসাধারণ সময় অতিক্রম করে। একই সময়ে বাংলাদেশে জন্ম নেয় হুমায়ূন আহমেদ, সৈয়দ শামসুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এবং সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর মতো শক্তিশালী সাহিত্যিক কণ্ঠস্বর।
এই লেখকেরা বাংলা সাহিত্যের পরিধি নতুনভাবে বিস্তৃত করেছেন। তাঁদের লেখায় উঠে এসেছে রাজনৈতিক সংগ্রাম, নগরজীবন, মানবমন, প্রেম, হাস্যরস এবং সামাজিক সংঘাত। বাংলা সাহিত্যের নতুন প্রজন্মের অনেক লেখক আজও তাঁদের সাহিত্যিক ঐতিহ্য অনুসরণ করে অনুপ্রাণিত হন।
তাঁদের মধ্যে হুমায়ূন আহমেদের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। তাঁকে অসাধারণ গল্পকার হিসেবে বর্ণনা করা হয়, যিনি বাংলা সাহিত্যে জাদুবাস্তবতা ও আবেগঘন সরলতার এক অনন্য ধারা তৈরি করেছিলেন। তাঁকে বাংলায় ম্যাজিক রিয়েলিজমের মাস্টার বলা হয়। যেমনটি বিশ্বসাহিত্যে গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ বা হারুকি মুরাকামির লেখায় দেখা যায়। তিনি প্রায় দুই শতাধিক উপন্যাস লিখেছেন, যার অনেকগুলোই বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। সত্যজিৎ রায়ের মতো তিনিও ছিলেন একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে বাংলা বই ও পাঠাভ্যাসের দিকে ফিরিয়ে আনতে অনুপ্রাণিত করেছেন।
এছাড়াও আরও অসংখ্য কবি ও সাহিত্যিক বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সৈয়দ মুজতবা আলী, জসীমউদ্দীন, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, শঙ্খ ঘোষ, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ, জয় গোস্বামী, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, হেলাল হাফিজ, রফিক আজাদ, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় এবং আরও অনেকে।
ভারতের প্রথম সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ১৯১৩ সালে বাংলায় আসে আমাদেরই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে। তিনি গীতাঞ্জলি—Song Offerings—গ্রন্থের জন্য এই সম্মান লাভ করেন, যার কবিতাগুলো তিনি নিজেই ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন এবং এর মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে বাংলা সাহিত্যের সৌন্দর্য তুলে ধরেন।
একইভাবে, ভারতের প্রথম অস্কারও বাংলায় আসে সত্যজিৎ রায়ের মাধ্যমে। ১৯৯২ সালে চলচ্চিত্রে আজীবন অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি এই সম্মাননা অর্জন করেন। সত্যজিৎ রায় কেবল কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দক্ষ লেখক, অলংকরণশিল্পী ও শিল্পীও।
এই অর্জনগুলো সুন্দরভাবে প্রমাণ করে যে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি তাদের স্বর্ণযুগে কত গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল—যা শুধু বাংলাকেই নয়, বিশ্বসাহিত্য ও শিল্পকেও সমৃদ্ধ করেছে।
সমষ্টিগতভাবে এই লেখকেরা বাংলা সাহিত্যকে শক্তিশালী, মানবিক এবং কালজয়ী করে তুলেছেন। তাঁদের সাহিত্য সমাজকে প্রভাবিত করেছে, আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করেছে, প্রজন্মকে দিকনির্দেশনা দিয়েছে এবং এমন একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নির্মাণ করেছে, যা আজও বিশ্বের বাঙালিদের হৃদয়ে জীবন্ত।
বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণযুগ কেবল কিছু মহান বই বা বিখ্যাত লেখকের গল্প নয়। এটি ছিল মানবচেতনার জাগরণ, সমাজকে প্রশ্ন করার সাহস এবং ভাষার মাধ্যমে সত্য প্রকাশের সৌন্দর্যের এক অনন্য অধ্যায়।
আমার বক্তব্যের শেষে নিজের সম্পর্কে অল্প কিছু বলতে চাই।
আমি শৈশব থেকেই লিখছি। ছোটবেলায় কল্পনা করতাম—একদিন হয়তো আমার লেখা ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হবে। তারপর একদিন সেই স্বপ্ন সত্যি হয়েছিল। প্রথমবার নিজের লেখা প্রকাশিত হতে দেখা আজও আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি।
সেই মুহূর্ত থেকেই আমার যাত্রা সত্যিকার অর্থে শুরু হয়। পাঠকেরা আমার গল্পকে আপন করে নেন, আর আমি আর কখনও লেখা থামাইনি। সময়ের সঙ্গে আমি প্রকাশ করেছি ১০টি বই, যার মধ্যে রয়েছে এবং একা, জানি সে আসবে না, আমাদের ঠিকানা বদলে গেছে এবং সাউদার্ন ভ্যালিওয়ে—যেগুলো পাঠকের কাছ থেকে উষ্ণ সাড়া পেয়েছে।
আমার অনুপ্রেরণার অন্যতম উৎস বাংলাদেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইন যাঁর কাছে আমার উপন্যাস লেখার হাতেখড়ি হয়েছে। পরিবারের সকলে বিশেষ করে আমার মা ও বড় ভাই- বোনদের কাছে অনুপ্রেরণা পাই। সবশেষে কৃতজ্ঞ অস্ট্রেলিয়াবাসী শ্রদ্ধেয় অজয় দাশগুপ্ত, যিনি আমাকে উৎসাহিত করেছেন এবং আজ আপনাদের সামনে একজন লেখক হিসেবে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছেন।
সৃজনশীল লেখালেখির পাশাপাশি আমি অস্ট্রেলিয়ার সিডনি থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় বাংলা অনলাইন সংবাদমাধ্যম- প্রশান্তিকা’র ব্যবস্থাপনা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। এই দায়িত্ব আমার লেখালেখির ভিতকে আরও শক্তিশালী করেছে, এবং আমি প্রতি বছর একটি করে কথাসাহিত্যের বই প্রকাশের চেষ্টা করে যাচ্ছি।
সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ।




