বার্ধক্য, ভাঙন আর নিঃসঙ্গতা । পিয়ারা বেগম 

বার্ধক্য, ভাঙন আর নিঃসঙ্গতা । পিয়ারা বেগম 

মানুষ এক সময় প্রাকৃতিক নিয়মেই জরাগ্রস্ত, বোধশূন্য, কখনোও বা স্মৃতিভ্রষ্ট হয়। অথচ এই আমরাই কতই-না মদির মৌতাতে স্বজন-পরিবৃত হয়ে উপভোগ করছি যাপিত জীবন। আমাদের আবর্তিত ও বিবর্তিত সমাজব্যবস্থায় ভাইয়ে-ভাইয়ে পৃথক হওয়ার রেওয়াজ আছে আবহমানকাল থেকে। তবে যৌথ পরিবারে দীর্ঘদিন থেকে শেষ সময়ে আলাদা হলেও সম্পর্কের সুতোটা কখনো ঢিলে হয়নি। কী এক অসামান্য বিশ্বজনীন স্নেহ, মায়া, মমতা ও পারস্পরিক ভালোবাসার বাঁধন ছিল নিউক্লিয়াসের মতো। আর এখন?

বর্তমানে ভয়ানক হারে ভেঙে যাচ্ছে যৌথ পরিবার। ভাঙার ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে নারীরাই বেশি এগিয়ে। ফলে যৌথ পরিবারের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। তাই আমাদের নৈতিক, পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় তলানিতে এসে ঠেকেছে।

ভাইয়ে-ভাইয়ে কিংবা ভাই-বোনের সম্পর্কেও নেই সেই আগের মতো অপার্থিব ভালোবাসা ও মানবিকতার স্পর্শ! এর মূলে আছে পৈতৃক সহায়-সম্পত্তি ও অর্থ-বিত্ত। মা-বাবার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিতে অপারগ অধিকাংশ পরিবারের সন্তানেরা। কেউ কেউ সহায়-সম্পত্তি জোরপূর্বক মা-বাবার কাছ থেকে লিখে নিচ্ছে। প্রতিবাদ করলে বাড়ি থেকে বের করে দিচ্ছে। আসলে পৃথিবীর মানুষ আজ ভোগ আর বিত্তলোলুপতায় উন্মাদ, আসক্ত। তাই তো তারা হারিয়ে ফেলেছে তাদের স্বাভাবিক বোধশক্তি ও মানবিকতা। নিজেদের বুকের রক্ত নিঃশেষিত করে সন্তানদের লেখাপড়া শেখান, প্রতিষ্ঠিত করেন। সে সন্তানেরাই মা-বাবার অন্তিম মুহূর্তে রাস্তায় ফেলে দিয়ে যায় কিংবা বৃদ্ধাশ্রমে পাঠায়।

এটাই শেষ নয়, বার্ধক্যে জুবুথুবু মায়ের খালি ফ্ল্যাটে মৃত্যু—ভাবা যায়? পচে দুর্গন্ধ হওয়ার ঘটনাও বিদগ্ধ সমাজবিশ্লেষকদের রীতিমতো স্তম্ভিত ও হতবাক করছে!

তাই তো জীবনের শেষ প্রান্তে এসে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব মেলাতে বিব্রতবোধ করছি। একদিকে যৌবনক্ষয়ের রিক্ততা, অন্যদিকে শারীরিক অবক্ষয়ের অসহায়ত্ব! কী নিদারুণ নিয়তি! বীতশ্রদ্ধ এ মন অপ্রকৃতস্থ হয়ে হাহুতাশ করি। চিরঅটুট পারস্পরিক রক্তের বাঁধন কখন যেন ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। এমন রূঢ় বাস্তবতাকে উপলব্ধি করে মানসিক বৈকল্যের শিকার হচ্ছেন অধিকাংশ বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। ভেতরে অব্যক্ত আর ফেনিয়ে ওঠা অনুভূতিগুলো ধুঁকে ধুঁকে ক্ষতবিক্ষত করছে প্রতিনিয়ত। তারপরও যদি দেখি সন্তানেরা মানুষ হয়েছে, সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে স্বচ্ছল অবস্থানে আছে, তখনই মনে প্রশান্তি আসে।

প্রশ্ন হচ্ছে, সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে এমন কয়টি পরিবার আছে? সংখ্যায় খুব কম। কেননা, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত মানুষ বেপরোয়া হয়ে উঠছে। বিনা পুঁজিতে, বিনা শ্রমে দ্রুত বিত্তশালী হওয়ার দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। উপরন্তু আকাশছোঁয়া বিত্তবাসনা আর অনন্ত চাহিদা পূরণে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে অনেকেই। তাহলে বৃদ্ধ মা-বাবারা কীভাবে নিশ্চিন্তে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করবেন? নিজ সংসারেই পুত্রবধূর মুখাপেক্ষী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা। তাদের না আছে কোনো বাকস্বাধীনতা, না আছে কোনো মান-মর্যাদা। অলিখিত আইনেই ক্ষমতার হাতবদল। সঙ্গত কারণেই অভাগা পিতামাতার দৈন্যদশা ও নিঃসঙ্গতা বেড়ে শেষমেশ গভীর ডিপ্রেশনে রূপ নিচ্ছে।

নদীর এক তীর ভাঙে, অন্য তীর গড়ে। আর এটাই নদীর সান্ত্বনা। আর নিজের সন্তানই যদি কুলাঙ্গার হয়, তাহলে এ দুঃখ ভোগের দায় কার ওপর বর্তায়? অথচ বাঙালি পরিবারে বৃদ্ধ বয়সের সবচেয়ে বড় পুঁজি, মূল্যবান সম্পদ তাদের সন্তান, যাদেরকে তাঁরা ভবিষ্যতের ভরসায় বড় করেন। অথচ এখন কপর্দকহীন শূন্য কলসের মতো ঠনঠন করছে। তার জীবনে শুধু ক্ষয়, ক্ষয় আর ক্ষয়ই। কোনো নতুন তীর গড়ছে না। তখনই তারা আরও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন।

আসলে সুখভোগে মানুষ অতীতকে নিয়ে ভাবে কম। কিন্তু দুঃখেই মানুষ স্মৃতিকাতর হয়। তখনই মানুষ কাঁদে। কখনো কাঁদে শূন্যতায়, কখনো কাঁদে হারানো শৈশবের কথা ভেবে।

হ্যাঁ, চর্মচক্ষুতে যে দিকে তাকাই, চারদিকে কেবলই শূন্যতা আর শূন্যতা। উপরন্তু স্বজনকর্তৃক আঘাত, অপমান-অপদস্থ আর দেহ-মনের অধোগতির মর্মপীড়ন! এতসব কষ্টের বোঝা যে তাকে একলাই বহন করতে হয়। এগুলোর অংশীদার মেলে না এ জগত-সংসারে। তখনই এক স্তূপ আবর্জনার মতো উচ্ছিষ্ট মনে হয় নিজেকে। তারপরও কেন যে মায়াবী এ পৃথিবীর কী এক দুর্নিবার আকর্ষণ! কেন অহর্নিশ বাঁচার তীব্র আকুলতায় মনটা হু হু করে কাঁদে। কিন্তু তা তো সম্ভব নয়। কারণ, এ পৃথিবীটা বৃদ্ধের নয়, জরাগ্রস্তের নয়। এ পৃথিবী যৌবনের, প্রকৃতির সৃজন শিশুদের। পৃথিবীর নিয়মই পুরাতনকে চলে যেতে হয়, আর নতুনদের স্থান করে দিতে হয়। কী অদ্ভুত মানুষের এই ক্ষীণায়ু জীবন! ঠিক যেন শিউলি ফুলের মতো। গভীর রাতে ফুটে আবার ভোর হওয়ার আগেই ঝরে যায়। প্রতিটি মানুষেরই শেষ পরিণতি যা নির্ধারিত, অবধারিতও। এ জীবন যেন এক অসমাপ্ত কাহিনি! তাই তো আফসোস আর অপূর্ণতা নিয়েই ওপরের ডাক আসলেই চলে যেতে হয়। আহা রে জীবন! অনিবার্য এমন পরিসমাপ্তিতে বাঁচার আকুলতায় তবুও কেন কাঁদে এ মন?

 

পিয়ারা বেগম
কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক