ছড়া ও ছন্দের বাংলাদেশি জাদুকর । অজয় দাশগুপ্ত

ছড়া ও ছন্দের বাংলাদেশি জাদুকর । অজয় দাশগুপ্ত

আমাদের গর্ব করার মতো বেশ কিছু মানুষ এখনো আছেন। তাঁদের মধ্য থেকে কেউ নাই হয়ে গেলে শঙ্কিত হই। কারণ এই সমাজে এখন আর বড় মানুষ জন্মায় না। বড় বলতে আমরা আসলে কী বুঝি? আজকাল বড় বলতে আমরা বুঝি অর্থবিত্ত বা রাজনীতির দাপটে বড় হয়ে ওঠা কথিত কেউ। কিন্তু একটা সময় ছিল, যখন খুব নীরবে বড় মানুষেরা জন্মাতেন। দারিদ্র্য যাদের স্পর্শ করলেও ম্লান করতে পারেনি।

আমাদের এই প্রবাসে, প্রবাসজীবনে যাঁরা আমাদের পথ দেখান, তাঁদের অনেকেই ছিলেন হতদরিদ্র। লালন ফকির, কাজী নজরুল—তাঁদের কিছুই ছিল না। অথচ আজও তাঁরা আমাদের পথিকৃৎ। তাঁদের আদর্শ, লেখা আর সংগ্রাম আমাদের অবলম্বন।

কয়েক দিন আগে চট্টগ্রামের এক উপশহরতলীতে এক কিংবদন্তির জীবনাবসানের খবর পেলাম। ছড়া মানে ছোটদের পড়ার জন্য—এমন ধারণাই চলে আসছে। মুখে মুখে প্রচলিত ছড়া সুকুমার রায়ের হাতে রাজকীয় অভিষেক পেয়েছে বাংলা সাহিত্যে। অতঃপর বাংলাদেশের চট্টগ্রামে জন্মেছিলেন আরেক সুকুমার। সে সুকুমার বড়ুয়া কী করলেন? যে কোনো খ্যাতিমান গদ্যশিল্পী, কবি বা অন্য কারও সমান উচ্চতায় নিয়ে গেলেন ছড়াকারদের। পরবর্তী কালে আমরা যারা ছড়া লিখেছি, তাদের শিরদাঁড়া শক্ত করে দিয়েছিলেন তিনি।

বাংলা ছড়া সাহিত্যে দু’জন সুকুমার। দু’জনের পিতৃভূমি, মাতৃভূমি বা আবাস বাংলাদেশে। অগ্রজজন আমাদের দেশের হলেও দেশভাগের পরে ভারতীয়। বাকিজন খাঁটি চাঁটগাঁইয়া। তাঁকে আমি প্রথম দেখি ঢাকায় তাঁর স্টাফ কোয়ার্টারের বাসায়। সাহিত্যিক বিশ্বজিৎ চৌধুরী, নাট্যশিল্পী সঞ্জীব বড়ুয়া ও আমি ছিলাম হরিহর আত্মা। তিনজন মিলে ঢাকা গিয়ে হানা দিয়েছিলাম তাঁর বাসায়। বড় দীনদরিদ্র, হতশ্রী অবস্থা। কিন্তু অসাধারণ সৃজনশক্তি আর উদ্ভাবনীতে তিনি তখন মধ্যগগনে।

আমি ভাবছিলাম—এমন একজন দিকপাল ছড়াকারের বাসায় ঢুকতে হলো ঘাড় নিচু করে? মাথা উঁচু করে গৃহপ্রবেশের মতো উচ্চতা ছিল না সে বাসায়। এই আমাদের ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া। তখন আমাদের অস্থিমজ্জার ভাঁজে ভাঁজে পশ্চিমবঙ্গের ছড়া। সে বাঁধন খুলে দিচ্ছিলেন ইনি এবং এর মতো আরও কয়েকজন।

কেউ কেউ বলে, তিনি নাকি লেখাপড়া জানেন না। যারা জানেন, কথিত উচ্চডিগ্রিধারী তারা কেউ কি স্বাধীনতার ঠিক আগে আগে ইয়াহিয়া খানকে নিয়ে এমন একটা ছড়া লিখতে পেরেছেন?

ব্যাঙের ছানা মাপতে এলো নাম করা এক মাপিয়ে

তিড়িং বিড়িং পালা থেকে সব পড়ে যায় লাফিয়ে

একটা যদি খাবলে ধরে তিনটে আবার উল্টে পড়ে

কি আর করে মনের দুঃখে লোকটা ওঠে হাঁপিয়ে

শেষে কি না কুয়োর জলে নিজেই পড়ে ঝাঁপিয়ে।

কি হয় কথিত সার্টিফিকেট বিদ্যার জোরে? কে এমন লিখতে পেরেছেন—

একটা ঘোড়ার নাম বেশি আর একটা ঘোড়ার দাম বেশি

দু ঘোড়াতে পেরিয়ে গেল চওড়া নদী জাম্বেসি।

দুনিয়ার চওড়া নদী যে জাম্বেসি, এটাও জানতেন তিনি। একবার তাঁর পঞ্চাশতম জন্মবার্ষিকীতে বিরাট এক আলোচনায় আমাকেও অতিথি করা হয়েছিল। সে সভায় টাকাপয়সাওয়ালা এক লোক—যাদের এখন স্পনসর বলা হয়—তেমন একজন খুব গর্ব করে বলছিলেন, আমাদের এই অগ্রজ ছড়াকার কীভাবে তার বাসায় থাকতেন এবং তাকে দিয়ে তিনি কী কী করিয়ে নিতেন। আমার মেজাজ গেল বিগড়ে।

আমি সুকুমার বড়ুয়ার কয়েকটি ছড়ার উদ্ধৃতি দিয়ে তাকে বিনীত আদেশ করেছিলাম, কিছু দিনের জন্য সুকুমার বড়ুয়ার বাড়িতে কাজ করে খেতে। তাতে যদি তার পাপমোচন ও বাঁচার সার্থকতা ফিরে আসে।

আমাদের দেশের সুকুমার বড়ুয়া একাত্তরের কঠিন সময়ে সাত দিনের বর্ণনা দিয়ে একটি ছড়া লিখেছিলেন। আজ অবধি তার যোগ্য ছড়া দেখিনি। সে ছড়ার কয়েকটা লাইন এমন—

এক তারিখের কাগজখানা আনলো বিরাট খবর

ঘূর্ণিঝড়ে দশটা লোকের জ্যান্ত হলো খবর

সাত তারিখে উঠলো নড়ে সাত মহলার ভিত

স্বপনপুরের কাচের পুতুল গড়িয়ে পড়ে চিত।

সত্তরের ঘূর্ণিঝড় থেকে স্বাধীনতার এমন সহজ বিবরণ ছড়ায় পাওয়া বিরল। সুকুমার বড়ুয়ার ছড়ায় মেহমান সব কিছু ঠিক আছে, ঠিক আছে বলে ছাতাখানা বগলদাবা করে নিয়ে যায়; জেগে থাকে ছন্দের অনুপম কারুকাজ। তার ছড়ার ভাঁজে ভাঁজে শিশু-কিশোর, বালকবেলা, বালিকার চুলের ফিতে, যৌবনের চোখ আর মনস্কদের ভাবনা ঘুরে বেড়ায়। এমন ছড়াকার আজ অবধি আর জন্মায়নি বাংলাদেশে।

যে মানুষটি তোয়াক্কা না করে লিখতে পারেন—

দেখছিরে ভাই দেখছি তোমার হক বিচারের নমুনা

খোলা মাঠে কইয়া দিমু কানে কানে কমুনা

তিনি যে হকবিচার পাবেন না, এটাই তো স্বাভাবিক। অনেক পুরস্কার আর সম্মাননা পাওয়ার পরও ছিলেন নীরবে নিভৃতে থাকা, অদেখা অচেনা এক ছন্দের জাদুকর।

ভয় পাই—এই ছন্দময় ছড়াকারকে আড়ালে রেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমরা ম্যাজিকের লণ্ঠন দিয়ে যাব কীভাবে?

শুরুতে তাঁর সঙ্গে প্রথম দেখার কথা লিখছিলাম। তখন আমি যৌবনেও পা দিইনি। সে বয়সে তাঁর গৃহপ্রবেশে ঘাড় নিচু করাটা তাঁর জন্য অসম্মানের মনে হয়েছিল। আজ পরিণত বয়সে, জীবনের অপরাহ্নে দাঁড়িয়ে মনে হয়—তা ঠিকই ছিল। অর্থবিত্তহীন আমাদের সুকুমার বড়ুয়া, আমাদের ছড়ার রাজার বাড়িতে যে ঢুকবে, যারা যাবে—তাদের তো মাথা নিচু করেই ঢোকা উচিত। এত বড় একজন মানুষের ছন্দের বাংলাদেশি জাদুকর থাকতেন নিভৃতে।

আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি অহংকারী, বিনয়হীন আর উদ্ধত মানুষে পরিপূর্ণ। সে জায়গায় সুকুমার দা ছিলেন মাটির মানুষ। প্রকৃত অর্থে একজন মাটির কাছাকাছি মানুষ। যিনি তাঁর জীবনে ছড়ার বাইরে আর কোনো কিছুর চর্চাই করেননি। এই জায়গাটাও আমাদের মনে রাখতে হবে। চাইলে তিনি অনায়াসে অন্য যে কোনো মাধ্যম চর্চা করে বিখ্যাত হতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। এর নাম পরিমিতিবোধ, এর নাম সংযম। এই সংযমের অভাবে কত লেখক, শিল্পী, সংস্কৃতিজন যে সব্যাসাচী হতে গিয়ে হারিয়ে গেছেন—তার কোনো হিসাব নেই।

এই যে অহংকারহীন জীবন আর নিভৃতচারিতা, তার ফলাফল সুকুমার বড়ুয়া হাতে হাতে পেয়ে গেছেন। পুরো দেশ, দেশের বাইরের বিস্তৃত বাঙালি ভূবনে তাঁকে জানে না—এমন মানুষ হাতে গোনা। আমি ব্যক্তিগতভাবে দেখেছি, তাঁর জন্য সম্মান আর শ্রদ্ধার দিকটা মনখোলা, অবারিত।

তাঁর একটা লঘু ছড়ায় আছে—

অসময়ে মেহমান

ঘরে এসে বসে যান…

আবার কি তিনি হঠাৎ এসে চমকে দেবেন আমাদের?

বিদায়, ছড়ার রাজা সুকুমার বড়ুয়া।