বাউল সংস্কৃতি, কপিরাইট ও বিস্মৃত স্রষ্টাদের জন্য আমাদের বৈষম্যবিরোধী নাগরিক ও রাষ্ট্রের দায় । আহমেদ আবিদ

বাউল সংস্কৃতি, কপিরাইট ও বিস্মৃত স্রষ্টাদের জন্য আমাদের বৈষম্যবিরোধী নাগরিক ও রাষ্ট্রের দায় । আহমেদ আবিদ

বড় ভাই ড. শহীদাত খান মিল্টন ভাইয়ের আমন্ত্রণে সম্প্রতি শাকুর মজিদের প্রামাণ্যচিত্র ‘ভাটিবাংলার অধিরাজ: বাউলকবি রশিদ উদ্দিনের অধিকারহীনতার সন্ধানে’ দেখার সুযোগ হয়। রাজধানীর বনানীর ভিউ ফাইন্ডারে অনুষ্ঠিত এই প্রদর্শনী শুধু একটি তথ্যচিত্র দেখা নয়; এটি ছিল আমাদের লোকসংস্কৃতির ইতিহাস, সৃজনশীল শ্রম ও দীর্ঘদিনের অধিকারবঞ্চনার বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা।

ভাটিবাংলার বিস্মৃতপ্রায় সাধক বাউলকবি রশিদ উদ্দিনের জীবন ও সৃষ্টিকর্মকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই প্রামাণ্যচিত্র লোকসংগীতের উত্তরাধিকার, কপিরাইট এবং গবেষণাগত নৈতিকতা নিয়ে জরুরি কিছু প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—আগামী ২১ জানুয়ারি ২০২৬, রশিদ উদ্দিনের ১৩৭তম জন্মবার্ষিকীর প্রাক্কালে চলচ্চিত্রটির আনুষ্ঠানিক প্রদর্শনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই সময়নির্বাচন নিজেই একটি তাৎপর্য বহন করে, কারণ এটি স্মরণ করিয়ে দেয়—লোকসংস্কৃতির ইতিহাসে অনেক স্রষ্টাই আজও যথাযথ স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত।

১৮৮৯ সালের ২১ জানুয়ারি নেত্রকোণার বাহিরচাপড়া গ্রামে জন্ম নেওয়া রশিদ উদ্দিন ছিলেন ভাটিবাংলার লোকসংগীত ধারার এক গুরুত্বপূর্ণ সাধক। তিনি শুধু নিজে গান রচনা করেননি, গড়ে তুলেছিলেন বহু শিষ্য—যাঁদের মধ্যে শাহ আব্দুল করিম, উকীল মুন্সি ও জালাল খাঁ বাউলের মতো কিংবদন্তি শিল্পীরাও ছিলেন। অথচ এই গুরুর নাম আজ লোকসংগীতের মূল আলোচনায় প্রায় অনুপস্থিত।

শাকুর মজিদের প্রামাণ্যচিত্রে উঠে এসেছে এক বেদনাদায়ক বাস্তবতা। গত বছরের নভেম্বরে নির্মাতা বাহিরচাপড়া গ্রামে গিয়ে রশিদ উদ্দিনের হাতে লেখা পুরোনো পাণ্ডুলিপি দেখার সুযোগ পান। তাঁর উত্তরাধিকারীরা জানান, রশিদ উদ্দিনের বহু গান বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তি নিয়ে গিয়ে নাম বদলে নিজেদের নামে প্রচার করেছেন। ফলে যেসব গান আজ লোকসংগীতের পরিচিত ভাণ্ডারের অংশ, সেগুলোর প্রকৃত রচয়িতা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্পষ্ট ধারণা নেই।

এই সমস্যা নতুন নয়। আব্দুল আলিমের দরদি কণ্ঠে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা কালজয়ী লোকগান ‘এই যে দুনিয়া কিসেরও লাগিয়া’ থেকে শুরু করে কোক স্টুডিওর মতো বড় প্রযোজনায় পরিবেশিত ‘মা লো মা’—লোকসংগীতের দীর্ঘ যাত্রাপথে বারবারই প্রশ্ন ওঠে, গানের গীতিকার কে? মূল স্রষ্টার নাম কোথায়? বাণিজ্যিক সাফল্যের আলোয় কি আমরা লোকগানের স্রষ্টাদের ইচ্ছাকৃতভাবে আড়ালে ঠেলে দিচ্ছি?

লোকসংগীতকে প্রায়ই ‘জনতার সম্পদ’ হিসেবে দেখা হয়। এই ধারণার মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটি বড় সংকট—স্রষ্টার শ্রম, মেধা ও অধিকার উপেক্ষিত থাকা। এই প্রামাণ্যচিত্র আমাদের মনে করিয়ে দেয়, লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণ মানে শুধু গান টিকিয়ে রাখা নয়; স্রষ্টার ন্যায্য স্বীকৃতি নিশ্চিত করাও জরুরি।

এই প্রেক্ষাপটে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা জরুরি। প্রথমত, লোকসংগীতের গীতিকার ও স্রষ্টাদের একটি প্রামাণ্য নথিভাণ্ডার বা আর্কাইভ গড়ে তোলা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, লোকসংগীতের ক্ষেত্রেও কপিরাইট আইন প্রয়োগ ও উত্তরাধিকারীদের অধিকার সুরক্ষার বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তৃতীয়ত, গবেষণা ও প্রযোজনার ক্ষেত্রে নৈতিক মানদণ্ড মেনে চলা নিশ্চিত করা জরুরি।

‘ভাটিবাংলার অধিরাজ: বাউলকবি রশিদ উদ্দিনের অধিকারহীনতার সন্ধানে’ কেবল একটি তথ্যচিত্র নয়; এটি আমাদের সাংস্কৃতিক চর্চার প্রতি এক ধরনের প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা না গেলে আমরা শুধু একজন বাউল কবিকেই নয়, আমাদের লোকসংস্কৃতির ইতিহাসের একটি বড় অংশকেই নীরবে হারিয়ে ফেলব।

উপসংহার হিসেবে বলা যায়—যুবক শিক্ষার্থীরা যদি বৈষম্যমুক্ত সমাজ গড়ে তোলার দায়িত্ব গ্রহণ করে, তাহলে এটি সত্য প্রতিষ্ঠার এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগও হয়ে দাঁড়ায়। আমাদেরই দায়িত্ব নিশ্চিত করা যে, ইতিহাস ও সংস্কৃতির ন্যায্যতা সংরক্ষিত হবে।

লেখক পরিচিতি:

ড. আহমেদ আবিদ- প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা, শিক্ষক ও গবেষক। তিনি লোকসংস্কৃতি, সাংস্কৃতিক অধিকার ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিয়ে কাজ করেন।