সবুজ পাঞ্জাবি । রাশেদ রেহমান
তখনও রাত্রি গভীর হয় নাই। শেষ বিকেলের অসামান্য সূর্যাস্তের লাল আভাময় সন্ধ্যা পেরিয়ে হালকা কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে রাত প্রায় নিঝুম হতে চলেছে। শেয়াল-কুকুরের গগনবিদারী আহাজারিতে ঝিঁঝিঁ পোকার মাধুরী-মেশানো সুর কানে পৌঁছানো কঠিন। স্বজনহারা মানুষের বুকফাটা মর্মস্পর্শী কান্নার আবরণে ঢাকা তেলচিটে আকাশটায় শত সহস্র কোটি তারার মেলা—তবুও বিদঘুটে, অন্ধকারাচ্ছন্ন, অসহনীয় ব্যথাতুর, নির্ঘুম এক ভয়ংকর রাত। দাদীমা তাঁর সুশীতল হস্তখানা মাথায় সঞ্চালন করে আমাকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টায় মগ্ন।
স্তব্ধ নিঝুম আঁধারে বাইরে থেকে হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। স্তিমিত স্বরে কে যেন বাইরে থেকে বলছে
—মা, দরজাটা খোলো।
দাদীমা আড়ষ্টভাবে ঝুঁকে বসে অনুচ্চস্বরে, গম্ভীরভাবে শুধায়
—কে?
—মা, আমি আছাদ।
বাইরে থেকে কূলপ্লাবি আবেগমাখা কণ্ঠে জবাব দেয় মেজ কাকা। ধূসর আঁধারের মাঝে কেরোসিনের কুপির ক্ষীণ আলোয় দেখি দাদীমার স্নিগ্ধ হাসিতে মুখমণ্ডল চকচক করছে। উচ্ছ্বসিত আবেগ সংবরণ করে সন্তর্পণে দরজা খোলে দাদীমা। সহসা তড়িৎ বেগে ঘরে ঢোকে মেজ কাকা। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে অশ্রুসিক্ত কান্নায় ভেঙে পড়ে দাদীমা। তাঁর কান্নার শব্দে বিভিন্ন ঘর থেকে পরিবারের অন্য সবাই উঠে আসে। বাবা তাঁর স্নেহপ্রবণ হস্তদ্বয় দিয়ে মেজ কাকাকে অন্তরঙ্গ আলিঙ্গনে বুকে আবৃত করে ফুপিয়ে কাঁদতে থাকে।
মেজ কাকা সবাইকে আশ্বস্ত করে বলে— বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন, চারদিক থেকে মুক্তিবাহিনী হানাদারদের বিভিন্ন ঘাঁটি তাদের অধিকারে নিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধের চার মহাসংগঠক যুদ্ধকালীন অস্থায়ী সরকার গঠন করেছেন (মুজিবনগর সরকার)। তাঁদের মধ্যে আমাদের ক্যাপ্টেন মনসুর আলী অন্যতম। মুজিবনগর সরকার থেকে অস্ত্র চালনাসহ যুদ্ধের বিভিন্ন উপকরণ আমাদের সরবরাহ করছেন। কিছু দিনের মধ্যেই আমরা চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করব। ন্যায়ের জয় হবে।
ছেলের স্বপ্নমাখা বার্তায় অদ্ভুত আনন্দে ভরে ওঠে মায়ের মন। মায়ের স্পর্শকাতর হৃদয়টা ওর ভেতরের যাতনা বোঝে। দেশমাতৃকার ক্রান্তিলগ্নে ছেলের দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ ও প্রত্যয়বান শানিত বক্তব্যে দাদীমা বসন্তের ফুলের মতো সরস, তাজা হয়ে ওঠে। কৃতজ্ঞচিত্তে ছেলেকে বলে
—চূড়ান্ত বিজয় নিয়েই ঘরে ফিরবি, তার আগে নয়। আর একবার তোমার চরণে মাথা নোয়াবার জন্য আসব মা। আমার জন্য লাল কলারওয়ালা সবুজ পাঞ্জাবি বানিয়ে রাখবে। তোমার স্নেহের পরশ বুলানো পাঞ্জাবি পরে আমি রেসকোর্সে অস্ত্র জমা দিতে যাব।
বলেই অত্যাধিক দৃঢ়তায় বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। দাদীমা অশ্রুভরা কণ্ঠে বলতে থাকে কাকার যুদ্ধে যাওয়ার কাহিনি।
বড় আত্মভোলা, বেখেয়ালী ছেলে আমার। প্রথম যৌবনেই ভালোবেসে আমাদের না জানিয়ে ক্লাসমেট সীমা আক্তার পরীকে বিয়ে করেছিল আছাদ। তখন দু’জনেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করত। পরী শুধু নামেই নয়, দেখতেও স্বপ্নরাজ্যের পরী ছিল—শুনেছি। পরীর অসামান্য সৌন্দর্যে বিমোহিত আছাদ পরীকে বিয়ে করতে পারিবারিক সামঞ্জস্যতার কথা ভেবে একটুও কুণ্ঠাবোধ করেনি। আর সে কারণেই স্ত্রীকে শ্বশুরালয়ে রেখে রাজশাহীতে পড়ত আছাদ।
বিয়ের পাঁচ মাসের মাথায় অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় পরীর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। স্নাতক পরীক্ষার আগেই শুরু হয় বাঙালির স্বাধিকার আদায়ের আন্দোলন—স্বাধীনতা সংগ্রাম। বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। তখন পরীর কোলে এক বছরের ছেলে সায়েম। কলিজার টুকরা ছেলে ও প্রিয়তমা স্ত্রী পরীকে শ্বশুরবাড়িতে রেখেই দীর্ঘ তিন বছর পর ওর নানাবাড়িতে আসে আছাদ।
আমার বাবাই আছাদকে আমার সামনে নিয়ে আসে। ভয়ে ওর মুখটা নির্লিপ্ত ঔদাস্যে অন্যদিকে ফিরানো থাকে। আছাদের দৃষ্টি তখন খুঁজতে থাকে না-শোনা প্রশ্নের উত্তর। চারদিকে তখন যুদ্ধের দামামা বাজছে। ২৫ মার্চের ভয়াল রাতে পশ্চিমা হায়েনার নগ্ন থাবায় দিশেহারা, হতচকিত বাঙালি জাতি। জাতির এই দুর্দিনে শত অভিমান থাকা সত্ত্বেও আছাদকে বুকে টেনে নিই আমি। কিন্তু নাতি সায়েম ও পরীকে সঙ্গে না আনার জন্য কিছুটা ভর্ৎসনা করি ওকে।
অল্পদিনের ব্যবধানে গোটা পূর্ববাংলায় ছড়িয়ে পড়ে আইয়ুব বাহিনীর নগ্ন কাপুরুষোচিত বর্বর হামলা এবং তাদের দোসর বাংলা মায়ের কু-সন্তান দেশদ্রোহী রাজাকারদের লুটপাট ও নারীর সম্ভ্রম লুট করার কু-প্রতিযোগিতা। ভয়ে শঙ্কিত, বিহ্বলিত আমি। নাতি সায়েম ও পুত্রবধূ পরীকে দেখার অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষায় উদ্বিগ্ন মনটা। আমি পরী ও সায়েমকে বাড়িতে আনার ইচ্ছা প্রকাশ করায় আছাদ কলিজার টুকরা ছেলে ও প্রেমময়তার সঙ্গী প্রিয়তমা স্ত্রীকে কাছে পাওয়ার আনন্দে আত্মহারা।
পরদিন সকাল হওয়ার আগেই, অর্থাৎ ভোররাতেই রাজশাহীর উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায় আছাদ। রাজশাহী তখন অত্যাচারী হায়েনার তাণ্ডবলীলা ও অমানবিক হত্যাযজ্ঞে নিথর মৃত্যুপুরীতে রূপ নিয়েছে। আছাদ যখন ওর শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছায়, নিষ্পাপ সূর্যটা তখন অভিশপ্ত দিনের আলো থেকে মুক্তি নিয়ে রাত্রির অতল গহ্বরে মুখ লুকিয়েছে। মর্ত্যলোকের পশুদের হিংস্রতাকে আকাশ তার চোখের জলের বোবা কান্নার বৃষ্টিতে ধুয়ে-মুছে দিচ্ছে। থমথমে এক ভয়ংকর রাত।
বাড়ির আঙিনায় পা রাখতেই বজ্রের আলোকঝলকানি ও আলো-আঁধারির ধূসরতার মাঝে দেখতে পায় উঠোনে পড়ে থাকা কয়েকটি লাশ। প্রথমে শ্বশুর, পরে দুই শ্যালক—আর একটু এগুতেই উঠোনের কোণায় চোখে পড়ে বেয়নেট দিয়ে খোঁচানো নিষ্পাপ শিশু সায়েমের রক্তাক্ত লাশ। হৃদয়ে ফিনকি দিয়ে থেমে যায় যন্ত্রণা, যেন হঠাৎ বজ্রপাতে কলিজা ছিদ্র হয়ে যায়। ছেলের গলিত-বিকৃত লাশ বুকে নিয়ে পাগলের মতো প্রলাপ বকতে থাকে আছাদ।
আছাদের বিলাপ শুনে পাশের বাড়ির সম্ভ্রমহারা, অর্ধপাগলিনী কাজের মেয়ে শোলার মুঠিতে আগুন জ্বালিয়ে দেখতে আসে এবং চিৎকার দিয়ে বলে
—আল্লা গো, এনা দেহি বড় কুটুম গো! পোলারে নিতে আইছো? পোলা কতা কয় না! আর কোনদিন কতা কইবো না! কুত্তারা দুধের পোলাডারে বাইচপার দিল না! তোরেও ছাইরবো না! তুই ভেগে যা এহনি! পরীরে ওরা ধইরা নিছে—পাছে আমারেও নিব! কী মজা! কী মজা! হা… হা… হা…
বুকে পাষাণ বেঁধে কলিজা-ছেঁড়া ধন সায়েমকে কোনোমতে রাতেই কবরস্থ করে কবর ছুঁয়ে শপথ নেয় আছাদ—
‘জীবন দিব, তবুও পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে দেশকে মুক্ত করব, ইনশাআল্লাহ।’
প্রতিশোধের রণতূর্য প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল রক্তে-মাংসে, ধমনী-শিরা-উপশিরা, অস্থি-মজ্জায়। পরদিন বাড়িতে এসে বাংলা মাকে মুক্ত করার দৃঢ় প্রত্যয় আমার কাছে পুনর্ব্যক্ত করে। আমি তখন ওর ভেতরের যন্ত্রণাকে না বুঝে ছেলে হারানোর ভয়ে অস্বীকৃতি জানালে রাতের অন্ধকারে ওর ছোট মামাকে নিয়ে পালিয়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগদান করে। এরপর আর বলতে পারে না দাদীমা—অশ্রুসিক্ত নয়নে ফুপিয়ে কাঁদতে থাকে।
এভাবে শত বাঁধা-বিপত্তি ডিঙিয়ে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে বাংলা মায়ের দামাল ছেলে—কৃষক, মজদুর, ছাত্র, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সর্বস্তরের মুক্তিকামী বাঙালি—নগ্ন হায়েনার ছোবল থেকে দিনকে দিন এক-এক অঞ্চল শত্রুমুক্ত করতে করতে অবশেষে আসে স্বপ্নের সেই প্রহর; আমাদের কাঙ্ক্ষিত বিজয়—১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর। গোটা বাঙালি জাতি স্বজনহারা ব্যথা ভুলে বিজয়ের আনন্দে মেতে ওঠে। আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছিল—‘জয় বাংলা’ স্লোগান।
দাদীমা জয়নব বেগম পাঞ্জাবি হাতে নিয়ে প্রতীক্ষায় থাকে। সবাই বলে, আছাদ আর আসবে না—পাঞ্জাবীটা ফকির-মিসকিনকে দিয়ে দিন। দাদীমা বলত—
“তোমরা দেখে নিও, আছাদ ঠিকই আসবে। বড় আত্মভোলা ছেলে আমার; ও হয়তো বিজয়ের আনন্দে পাঞ্জাবীর কথা ভুলেই রেসকোর্সে চলে গেছে। ও আসবেই। ও আমাকে কথা দিয়ে গেছে—ও ফিরে আসবে একটি স্বাধীন মানচিত্র খচিত লাল-সবুজের পতাকা হাতে নিয়ে।”
এভাবে প্রতীক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে পেরিয়ে গেছে ৩৫টি বছর। আজ দাদীমা নেই—আজও আসে ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস, ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের দিন—আর কেউই বীর মুক্তিযোদ্ধা আছাদের প্রতীক্ষায় অষ্টপ্রহর চেয়ে থাকে না। সন্তানহারা দাদীমার অযাচিত প্রতীক্ষার ৩৫টি বছর, দুর্বিষহ দিনগুলোর অসহনীয় স্মৃতি, অশ্রুসিক্ত অন্ধপ্রায় ঝাপসা ধূসর চোখ আজও আমায় খুঁজে ফেরে। অহর্নিশ যন্ত্রণা দেয় মেজ কাকার সেই সবুজ পাঞ্জাবি।




