বহিবারে দাও শকতি । অজয় দাশগুপ্ত

বহিবারে দাও শকতি । অজয় দাশগুপ্ত

নিজেকে আমি ভাগ্যবান মনে করি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি। সে যুদ্ধের সময় আমার বালক বেলায় যে ঐক্য আর সংহতি, তা আর কখনো দেখিনি। দেখেছি বঙ্গবন্ধুকে—আমাদের চোখের সামনে মহীরূহ হয়ে ওঠা এক বাঙালি নেতা। আমার সৌভাগ্য হয়েছে বিজয় দিবস দেখার। সহজ ছিল না সেই বিজয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা চাপ আর যুদ্ধংদেহী পরিবেশ কাটিয়ে বাঙালি প্রথম স্বাধীনতার স্বাদ লাভ করেছিল ১৬ ডিসেম্বরে। স্মরণ করি মরহুম সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদসহ চার জাতীয় নেতাকে। আমাদের পরম বিস্ময় ছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা—যাঁরা জান না দিলে, যুদ্ধ না করলে বিজয় অর্জিত হতো না। কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি মিত্রবাহিনীর শহীদ যোদ্ধাদের। এসব মিলিয়েই বিজয় লাভ করেছিল পূর্ণতা।


আজ এত বছর পর এসে স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়—বাঙালি কেমন আনন্দময় এক স্বাধীন পটভূমি নির্মাণ করতে পেরেছিল। আমরা শারীরিক এবং আর্থিকভাবে তখন অনেক পিছিয়ে। কাঠামোগতভাবে সবকিছু দুর্বল। তারপরও আমাদের জয় নিশ্চিত হয়েছিল মাতৃভূমির প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা আর নিজেদের বিলীন করার মহান ব্রতে। যে কোনো সংগ্রাম বা পরবর্তীকালের যে কোনো আত্মদানের গৌরবময় ভূমিকা রেখেছিল বিজয় দিবস। আমরা সেবার প্রমাণ করে দিয়েছিলাম—বাঙালি পারে। সে তার জীবন বাজি রেখে হলেও নিজেদের জয় ছিনিয়ে আনতে পারে।

সময় অনেক কিছু ভুলিয়ে দেয়। কিন্তু সব কি ভুলিয়ে দিতে পারে? যদি পারত, আমরা কি উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মাহুতি দেওয়া সূর্য সেন, প্রীতিলতা বা তিতুমীরের কথা ভুলতাম? সেটা হয়নি। হয়নি, কারণ ইতিহাস একবারই রচিত হয়। আজ এমন একজন মানুষের কথা লিখব, যিনি রক্তে-মাংসে বাঙালি না হয়েও ছিলেন আমাদের পরম বন্ধু। যাঁর অবদান আমি এই প্রশান্তপারে বসেও স্মরণ করি। যাঁর ভূমিকা আমাদের জীবনে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।

বিজয় দিবসের গর্বিত শরিক, তিনি আমাদের একমাত্র বিদেশি বীরপ্রতীক ডব্লিউ এস ওডারল্যান্ড। মুক্তিযুদ্ধকালে ঢাকার বাটা সু কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন। তরুণ যোদ্ধা হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। জন্মসূত্রে ছিলেন নেদারল্যান্ডসের নাগরিক। পরে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব নেন। ওডারল্যান্ড থাকতেন পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার পার্থ শহরে। যখন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ হয়, তখন তিনি চোখে ভালো দেখতে পেতেন না। স্নায়ুও নিয়ম মেনে চলছিল না। রক্তচাপ ছিল আয়ত্তের বাইরে। ফলে বেশির ভাগ সময় তিনি কাটাতেন বিছানায়। কোনো ধরনের উত্তেজনা বা চাপ নেওয়া ছিল ডাক্তারের বারণ। তবু ‘বাংলাদেশ’ নামটা শুনলেই উত্তেজিত হতেন। মাঝেমধ্যে প্রচণ্ড আবেগ আর রাগে ফেটে পড়তেন। বারবার চেষ্টার ফলে একসময় তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়। খুব কাঁপা-কাঁপা কণ্ঠে ধীরে ধীরে কথা বলেছিলেন সেদিন। তাঁর কথা ছিল একটাই—যে জাতির জন্য তিনি জান হাতে লড়াই করেছিলেন, তাদের নৈতিক অধঃপতন তাঁর ভালো লাগত না। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড এবং পরে জাতীয় চার নেতাকে কারাগারে হত্যার পর বাংলাদেশের রাজনীতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। যে কারণে রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দিতে দ্বিধা করেননি এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবসকে প্রচণ্ড শ্রদ্ধা করা মানুষটি বলেছিলেন, ১৬ ডিসেম্বর যদি ফিকে হয় বা কোনো কারণে অনুজ্জ্বল হয়ে পড়ে, মনে রাখতে হবে—তাঁর বা তাঁর মতো যাঁরা আত্মত্যাগ করেছিলেন, তাঁদের আত্মার অভিশাপ এড়ানো যাবে না। আমি জানি না, এমন অমোঘ সত্য কথাটি তিনি কেমন করে বলেছিলেন সেদিন। আমার গর্ব, এ দুই বিদেশি বীরের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছিলাম। তাঁদের মতো আরও অনেকেই আছেন আকাশের তারায় তারায়। তাঁদের কথা যেন বিফলে না যায়। এ দেশ ও মাটি তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ। এখন দায় আমাদের।

একটি জাতি স্বাধীনতার এত বছর পেরিয়ে আসার পরও যদি তার ইতিহাস আর অতীতকে ভালোভাবে না জানে, তার চেয়ে দুঃখের আর কিছুই হতে পারে না। আজকের প্রজন্ম কিছুই জানে না। এসব বিদেশির কথা শোনেনি। কারণ আমাদের পাঠ্যবই বা আমাদের লেখাপড়ার কোথাও এদের কথা বলা হয় না। এর দায় আমাদের। যাঁরা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে আমাদের মুক্তির জন্য জান দিতে চেয়েছিলেন, ঝুঁকি নিয়েছিলেন—তাঁদের কাজ তাঁরা করে গেছেন। কৃতজ্ঞ জাতি হলে সারা জীবন তা মনে রাখত। আমরা এখনই ভুলে যেতে বসেছি। তবে কি তাঁদের কেউ বেঁচে থাকলে বা তাঁদের উত্তরসূরিরা ধরে নেবেন যে ভুল দেশের ভুল মানুষের জন্য তাঁরা লড়াই করেছিলেন? এর উত্তর আমাদের ইতিহাস। এর জবাব দেবে সরকার। এর দায় নিতে হবে সবাইকে। এত বড় ইতিহাস আর এমন মানুষদের যদি আমরা মনে না রাখি, ইতিহাস আমাদের মার্জনা করবে না। যেসব বিদেশি ভালোবেসে ত্যাগ স্বীকার করে, সঙ্গে থেকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয়কে ত্বরান্বিত ও সফল করেছিলেন, তাঁদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। স্যালুট আপনাদের, হে মহান আত্মার বিদেশি স্বজন।

আজকের বিজয় দিবস আরেক ধরনের বাস্তবতা নিয়ে হাজির হয়েছে। এটা ইতিহাসেরই খেলা। সে কখনো সহজ-সরল পথে চলে না। তার বাঁকে বাঁকে অনেক ঘটনা, অনেক অনিশ্চয়তা। ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ জাতি মনে রাখবে। মনে রাখবে তার ওপর চেপে বসা যে কোনো কঠিন শাসনের বাস্তবতা। সে কারণে আমাদের ভূমিকা হতে হবে ইতিহাস আর অতীতের সঙ্গে সম্পৃক্ত—যাতে একবারের জন্যও গৌরব পদদলিত না হয়। তা হলেই আপন মহিমা আর স্বভূমিকায় জ্বলে উঠবে বিজয়। বিজয় অর্জনের চেয়ে তাকে লালন-পালন করা, সমুজ্জ্বল রাখা অনেক কঠিন। আজ তাই ভেদাভেদ আর অনৈক্যের পরিবর্তে ১৯৭১ সালের বিজয়, তার অখণ্ডিত ইতিহাস আমাদের দরকার। আমাদের ছায়া হয়ে থাকুক এই মহান দিন। আমাদের বুকের ভেতর সাহস আর ‘জয় বাংলা’-র প্রতীক হয়ে থাকুক চিরকাল।

সিডনি