আকাশ নদী জল, ছুঁয়ে চলুক জলের গান । অজয় দাশগুপ্ত

আকাশ নদী জল, ছুঁয়ে চলুক জলের গান । অজয় দাশগুপ্ত
বাঙালি এক কালে বিশ্বাস করতো: আমরা হেলায় লংকা করেছি জয় । বিজয় সিংহের উত্তরাধিকারী বাঙালি এখন বিশ্বজয় করে চলেছে। আমাদের এই প্রিয় সিডনি শহরে বাংলা গান, কবিতা , নাটক, আড্ডা সবকিছু তুঙ্গস্পর্শী । কোনদিন কোথায় কি হচ্ছে বা হবে সে নির্ঘন্ট জানতে এখন মোটামুটি মিডিয়া দরকার। একটা কথা মানতেই হবে স্থানীয় আর অস্থানীয় দেশের কিংবা দেশের বাইরের প্রতিভার সম্মিলনে টগবগ করে ফুটছে সিডনি, সব অনুষ্ঠান যে মনে দোলা দেয় এমন না। আবার সবকিছু যে মনের মত হবে তাও ঠিক না। যারা সংস্কৃতি চর্চা করছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলি গতকাল অর্থাৎ ৮ ফেব্রুয়ারি রোববার এই অনুষ্ঠানে না গেলে আমি খুব খারাপ কিছু করতাম। 
এ লেখা যারা পড়বেন তাদের বেশির ভাগই শফিকুল আলমকে চেনেন না । নোমান শামীমকেও না। এরা আমার বন্ধু ও অনুজ। শফিক ভাই একসময়কার দাপুটে ছাত্র নেতা। শামীম এখন ব্যস্ত তরুন নেতা ও সংগঠক। তাদের কথা আগেভাগে বলছি এই কারনে একজন আমাকে টিকেট দিয়ে কৃতার্থ করেছেন অন্যজন অত দূরের পথা পাড়ি দিয়ে আসা যাওয়ার ব্যবস্থা করেছে । আচ্ছা কেন আমার খারাপ বোধ হতো কাল না গেলে?

ব্রায়ান ব্রাউন থিয়েটার হলটিতে এ যাবৎ আমি যতগুলো অনুষ্ঠান দেখেছি তার ভেতর যে দুটো আয়োজন আমাকে মুগ্ধ করেছে তার একটি ঘটেছে গতকাল সন্ধ্যায়। যে অনুষ্ঠানে আসর মাত করেছে জলের গানের কান্ডারি রাহুল আনন্দ আর তার যোগ্য সহযোগী কনক আদিত্য। আর একটিতে অতিথি হয়ে এসেছিলেন অধ্যাপক লেখক ড: মুহম্মদ জাফর ইকবাল।
আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এই দুই আয়োজনের অতিথি বা নামী মানুষদের কেউই এখন দেশে থাকেন না। থাকতে পারেন না। রাহুল আনন্দের জলের গান আমাদের গানের জগতে জলপ্রপাতের মতো বয়ে যাচ্ছিল। ওপার বাংলার সংস্কৃতিজনদের ধারণা আমাদের বাংলাদেশে গান বাজনা বা অন্য কিছু মোটামুটি চলন সই গোছের। তাদের এই নাক উঁচু মনোভাবের নাকটা ভোঁতা করে জলের গানকে গাইতে দেখেছি গানের রিয়েলটি শোতে । এমন যদি হতো আমি পাখির মতো, এ ই গানের সাথে রাহুলের বাহু তোলা পাখির নাচে তাদের নাচতে দেখেছিলাম ।
তবে জলের গানের সাথে নিবিড় পরিচয় ঘটে আমার প্রিয়ভাজন সংবাদিক মুন্নী সাহার কল্যানে। সেই মুন্নী সাহা  এখন দেশে থেকেও নাই । আজ এই লেখা টি লেখার আগে দুটো চমৎকার ঘটনা ঘটেছে । যার একটি মুন্নীর সাথে আলাপ। আমি তাকে জানিয়েছিলাম যে গতকাল জলের গান সিডনিতে  গান গেয়েছে । উত্তরে মুন্নী আমাকে রাহুল আনন্দের সাথে তার ভালোবাসা ও সম্পর্কের কথা জানিয়ে বললো, তাদের নতুন মিডিয়া এক টাকার খবরেও না কি জলের গানকে বেশ ভালো একটা অনুষ্ঠান হয়েছিল। 

 যে কথা বলছিলাম জলের গানের দুই পুরোধা গায়ক রাহুল আনন্দ আর কনক আদিত্য কাল মাতিয়ে রেখেছিল আমাদের। জলের গান বাংলাদেশের একটি ব্যান্ড দল। এই ব্যান্ড মূলত ফোক-ফিউশন ধারায় গান গায়। ২০০৬ সালে এই ব্যান্ড প্রতিষ্ঠিত হয়। ঝরা পাতা, বৃষ্টির গান, বকুল ফুল এরকম অসংখ্য গানের জন্য বর্তমান সময়ে দেশের জনপ্রিয় ফোক ব্যান্ডের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে ব্যান্ড দল ‘জলের গান’।
তারা যে জায়গা করে নিয়েছিল তার বড় প্রমাণ এই সিডনিতে অনেক দল ও গায়ক গায়িকারা দর্শক শ্রোতাদের অনুরোধে. মন রাখতে বকুল ফুল বকুল ফুল সোনা দিয়া হাত কেন বান্ধাইলি গানটা গেয়ে গেছেন। যে দৃশ্যটা মনে করব, এই গানটি গীত হলেই আমাদের নারী শ্রোতাদের ভেতর দাঁড়িয়ে নাচ করবার যে কৌতুহল তা সহজে দেখা যায় না ।  দেশ পেরিয়ে বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে বেশ কয়কটা জলের গানের ধারা বয়ে গেছে নানা মহাদেশে। তার আরেকটি হচ্ছে এমন যদি হতো আমি পাখির মতো।
গতকাল তাদের অনেকগুলো গানের কথা শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল কোথাও ঘাপটি মেরে শুনছেন ভূপেন হাজারিকা । সেই যে গানগুলো যেগুলো খুব উচ্চকিত না আবার মিনমিনেও না তার ই আভাস দিচ্ছিলেন এরা দু জন। আমাদের সহজাত ধারণা গণমুখি গান বা জীবনের গান বা তীব্র প্রতিবাদ চড়া কন্ঠ ঝাঁঝালো সুরের কোন গান । সে ধারণাতো বটেই প্রচলিত ব্যান্ডের ধারণার বাইরে জলের গানের পদচারণা । আমি কোন ব্যান্ডের গায়ককে বাউলের পোশাক পরে এমন করে গাইতে দেখি নি। তাও পরিমিত কন্ঠে । অনেকে বলবেন বা বলছেন সুরের কথা। মিহি কাজ , লয় মেনে ব্যকরণ মেনে গান করা কি  কি যেন বলে না সেগুলো খুঁজলে আপনি ফাঁক ফোকর পেতেই পারেন। কিন্তু কেউ তো কৌশিকী চক্রবর্তীর গলার কাজ শুনতে যান নি কাল। গিয়েছিলেন মন ভালো করা গান শুনতে । সেটা পরিপূণর্তা পেয়েছে গতকাল ।
আমি যেটা সবচেয়ে বেশী উপভোগ করেছি রাহুলের দর্শক শ্রোতাদের আবিষ্ট রাখার শক্তি। কথা বলে পারস্পরিক ভাব বিনিময় করে এমনকি সিডনি স্টেজে প্রথমবার কোন অজি নারীকে ডেকে এনে তাকে দিয়ে গান গাইয়ে আসর জমানো  সম্ভবত: এই প্রথম। কথা হচ্ছে রাহুল আনন্দের পা থেকে মাথা পর্যন্ত যন্ত্র তার চটি বা জুতায় ও সুরের মূর্চ্ছনা । বাঁশীতে অনিন্দ্য মুখে হাত রেখে শব্দ তোলায় অনন্য রাহুল একজন সাচ্চা আর্টিষ্ট ।
অনেকেই জানেন  ঢাকায় দুই দিনের সংক্ষিপ্ত সফরকালে বাংলাদেশের জনপ্রিয় গানের দল “জলের গান” এর সংগীতশিল্পী, গীতিকার ও বাদ্যযন্ত্রী রাহুল আনন্দের ধানমন্ডির বাসার নিজস্ব স্টুডিওতে গিয়েছিলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট।পূর্ব নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী রবিবার রাতে রাহুল আনন্দের স্টুডিওতে  গিয়েছিলেন ফ্রেঞ্চ প্রেসিডেন্ট। সেখানে রাহুল আনন্দ ছাড়াও আরও তিন শিল্পী আশফিকা রহমান, কামরুজ্জামান স্বাধীন ও আফরোজা সারার সঙ্গে কথা বলেন এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। এ সময় শিল্পীদের গান শোনার পাশাপাশি বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র দেখেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট।
প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ রাহুল আনন্দের গান শোনেন। এসময় তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও কথা বলেন তিনি। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টকে একতারা বাজানো শেখান রাহুল, যা নিয়ে সেখানে আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
বহুকাল আগে শয্যাশায়ী  পরিচালক চলচ্চিত্র জগতের বিশ্ব কিংবদন্তী বাঙালি সত্যজিত রায়ের বেলায় এমনটা ঘটেছিল। ১৯৮৭ সালে ফ্রান্স সরকার তাকে সম্মানসূচক পুরস্কার লেজিওঁ দনরে ভূষিত করে। সেই পুরস্কার তুলে দিতে কলকাতা এসেছিলেন ফরাসী কর্তা । সে স্মৃতি অম্লান আছে কিন্তু রাহুল আনন্দের সেই বাড়ি বা যন্ত্রগুলো নাই। সে গুলো হিংসা ও প্রতিশোধের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে । কেন হিংসা বা কেন সেই আক্রমন তার কারণ জানা বারণ ।
রাহুল আনন্দ থেমে যাননি। এখন তিনি ফ্রান্সে থাকেন। ডানা মেলে দেশ বিদেশে পাখির মতো উড়ে উড়ে গান করেন। গতকাল অসাধারণ লিরিকের একটি গান ছিল এমন:
আকাশ নদী জল
ছুঁয়ে বলি চল
হারিয়ে যাই ....
গান শুনে ফিরে আসতে আসতে ভাবছিলাম: এমন হারিয়ে যাবার স্বপ্ন দেখানো ই তো গান । আনন্দ অবগাহনে সিক্ত করার জন্য অভিনন্দন রাহুল আনন্দ  ও কনক আদিত্য । ভালোবাসা জলের গান দীর্ঘ হোক পদযাত্রা ।