রিল থেকে রিয়েল : থালাপতি বিজয়ের জয়ের গল্প । ড. আবদুল্লাহ আল মামুন

রিল থেকে রিয়েল : থালাপতি বিজয়ের জয়ের গল্প । ড. আবদুল্লাহ আল মামুন

বলিউডের হিন্দি সিনেমা দেখা ছেড়েছি এক যুগেরও বেশি সময় আগে। কর্মসূত্রে দীর্ঘদিন মধ্যপ্রাচ্যে থাকার সময়ই দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। কেরালার সহকর্মীদের হাত ধরে মালায়ালাম সিনেমার সঙ্গে পরিচয়। বিশেষ করে দুই কিংবদন্তি মালায়ালাম তারকা মাম্মুটি ও মোহনলালের কাজ। অভিনব গল্প, সংযত অথচ শক্তিশালী অভিনয়, এবং বাস্তবধর্মী উপস্থাপনা—সব মিলিয়ে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা।

সেখান থেকে ধীরে ধীরে তেলেগু সিনেমার মেগাস্টার চিরঞ্জীবি এবং দক্ষিণ ভারতের আইকন রজনীকান্তের প্রতিও আকর্ষণ জন্মায়। একটি বিষয় স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে—এই তারকারা বয়স লুকানোর চেষ্টা করেন না। বরং বয়সের স্বাভাবিকতাকেই তাঁরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ধারণ করেন।

রজনীকান্তকে ধরুন। সত্তরের কোঠায় পা রেখেও সাধারণ সাদা পাঞ্জাবি, মাথার টাক আর স্বাভাবিক চেহারাতেই জনসমক্ষে হাজির হন। মোহনলালও সিক্স-প্যাকের মোহে না পড়ে নিজের স্বাভাবিক শরীরী গঠনেই স্বচ্ছন্দ। এই সরলতা এবং বাস্তবতাই তাঁদের আলাদা করে তোলে। ফলে দর্শক তাঁদের শুধু পর্দার চরিত্র হিসেবে নয়, নিজের মানুষ হিসেবে গ্রহণ করে। ভালোবাসে অন্তর থেকে।

অথচ বলিউডের অনেক সুপারস্টার যেখানে ষাট পেরিয়েও পর্দায় ২৫ বছরের তরুণ সাজার চেষ্টা করেন, সেখানে বাস্তবতা অনেক সময়ই হারিয়ে যায়। এমনকি বস্তির গল্পেও নায়ক-নায়িকার চেহারা ও শারীরিক গঠন দেখে মনে হয় যেন তারা কোনো আন্তর্জাতিক ফ্যাশন মডেল, যা গল্পের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

এই বাস্তবতার ধারাবাহিকতায় পরবর্তী প্রজন্মে উঠে আসেন তামিল সিনেমার জনপ্রিয় তারকা থালাপতি বিজয়। যাকে ঘিরেই আজকের এই আলোচনা।

মাত্র দুই বছরের মধ্যে নিজের রাজনৈতিক দল ‘তামিলগা ভেত্রি কাজাগাম (টিভিকে)’ গঠন করে ১০৮টি আসনে জয়। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, কীভাবে সম্ভব হলো এই সাফল্য?

দক্ষিণ ভারতে অভিনেতাদের রাজনীতিতে আসার ইতিহাস নতুন নয়। তামিল সুপারস্টার কমল হাসান এখন রাজ্যসভার সদস্য, চিরঞ্জীবি অন্ধ্র প্রদেশে মন্ত্রিত্ব করেছেন। তবে বিজয়ের আগে সবচেয়ে সফল উদাহরণ নিঃসন্দেহে এনটি রামা রাও। যিনি তিন দফায় অন্ধ্র প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তবে থালাপতি বিজয়ের সাফল্য বোঝার জন্য তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটি গুরুত্বপূর্ণ।

তামিলনাড়ুর রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে মূলত দুটি দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ: ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে এই দুই দলই পালাক্রমে ক্ষমতায় এসেছে। মজার বিষয়, এআইএডিএমকের প্রতিষ্ঠাতাও মূলত ডিএমকে থেকেই বেরিয়ে আসা একজন নেতা। ফলে সাধারণ মানুষের চোখে এই দুই দলের মধ্যে তেমন কোনো মৌলিক পার্থক্য তৈরি হয়নি। এর আগে ১৯৫২ থেকে ১৯৬৭ পর্যন্ত টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিল কংগ্রেস। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের ক্লান্তি তৈরি হয়েছিল। তারা খুঁজছিল বিকল্প।

এই শূন্যস্থানটাই কাজে লাগান বিজয়। এবারের নির্বাচনে প্রায় রেকর্ড ৮৬ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন, যা পরিবর্তনের প্রবল আকাঙ্ক্ষারই ইঙ্গিত।

ক্ষমতাসীন দুই দল যেখানে জোট গড়ে মাঠে নামে, সেখানে বিজয় এককভাবে লড়ে ১০৮টি আসনে জয় পান। যেহেতু বিজয় নিজে দুটি আসন থেকে জয়ী হয়েছেন, তাই তাঁকে একটি আসন ছাড়তে হবে। এককভাবে সরকার গঠন করতে প্রয়োজন ১১৮টি আসন। ফলে ম্যাজিক সংখ্যা ছুঁতে হলে তাঁর আরও ১১টি আসন প্রয়োজন। আর সেই কারণেই এখন শুরু হয়েছে জোট-সমীকরণের হিসাব। কংগ্রেস ইতিমধ্যে সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়েছে, অন্য দলগুলোও আগ্রহী। তবে চাবিকাঠি এখনো বিজয়ের হাতেই। শেষ পর্যন্ত কাদের সঙ্গে জোট গড়ে সরকার গঠন করবেন, সেই সিদ্ধান্ত তাঁরই।

টিভিকে আপাতদৃষ্টিতে নতুন দল হলেও বিজয়ের রাজনৈতিক যাত্রা কিন্তু নতুন নয়। ২০০৯ সালে তিনি ‘Vijay Makkal Iyakkam’ (Vijay’s People Movement) নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে সমাজকল্যাণমূলক নানা কাজ, সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের সহায়তা, স্কলারশিপ প্রদান, শিক্ষা উপকরণ বিতরণ ইত্যাদির মাধ্যমে তিনি গড়ে তুলেছেন শক্তিশালী জনভিত্তি। এই কাজগুলোই আজ তাঁর রাজনৈতিক শক্তির মূল ভিত্তি।

বিজয়ের সাফল্য একটি বিষয় পরিষ্কার করে—রাজনীতিতে শর্টকাট বলে কিছু নেই। বিজয়ের দুই দশকের নীরব প্রস্তুতি তারই প্রমাণ। একইভাবে পাকিস্তানে ইমরান খানও প্রায় ২০ বছর পর ক্ষমতায় পৌঁছেছেন। দীর্ঘদিন ধরে মানুষের পাশে থাকা, নীরবে কাজ করে যাওয়া—এই ধারাবাহিকতাই একসময় বড় শক্তিতে রূপ নেয়।

আমাদের দেশেও তরুণদের একটি নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে অনেক আশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু জনসম্পৃক্ততার পথ বেছে নেওয়ার বদলে তারা দ্রুত ক্ষমতায় যাওয়ার আশায় একটি পুরোনো দলের সঙ্গে জোট করে বসে। ফলে হারিয়ে যায় তাদের স্বকীয়তা, দুর্বল হয়ে পড়ে জনসংযোগ। অথচ দক্ষিণ এশিয়ারই আরেক দেশ নেপালে তরুণদের পছন্দের দল জনসমর্থন নিয়ে নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে।

প্রশ্নটা তাই থেকেই যায়—আমরা কি এই শিক্ষা নিতে প্রস্তুত?

ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন: লেখক, গীতিকার, কন্ঠশিল্পী ও প্রকৌশলী। বর্তমানে তিনি সিডনি, অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- খুঁজে পেয়েছি প্রিয়তমা, কাতারে জীবন যেমন, ভাবনার দিগন্তে এবং কাতারে বহতা জীবন।