গতকাল সন্ধ্যায় ওয়েস্টার্ন সিডনির CommBank Stadium–এ যা দেখলাম, তা শুধুই একটি ফুটবল ম্যাচ নয়—এ ছিল সাহস, স্বপ্ন আর আত্মমর্যাদার এক অনবদ্য প্রদর্শনী। এএফসি উইমেন্স এশিয়া কাপ- অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম বারের মতো অভিষেক হলো বাংলাদেশের নারী ফুটবল দলের। চীনের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে হেরে গিয়েও একটুও মন খারাপ হয়নি। বরং বুকের ভেতর গর্ব আর শ্রদ্ধার ঢেউ উঠেছে বারবার। কারণ আমি আমাদের মেয়েদের চোখে দেখেছি লড়াইয়ের আগুন, পায়ে দেখেছি দৃঢ়তা, আর হৃদয়ে দেখেছি প্রতিজ্ঞাবদ্ধতা।
রিতুপর্ণা, মারিয়া, আকাইদা, তফুরা, আনিকা—যখন ওরা মাঠে নামল, তখন আমার চোখ ছলছল করছিল। মনে হচ্ছিল, আহা! এই ছোট ছোট মেয়েগুলো দাঁড়াবে লম্বা-চওড়া চীনা মেয়েদের সামনে! কাগজে-কলমে শক্তির হিসাব, র্যাংকিংয়ের ব্যবধান—সবকিছু যেন মুহূর্তে তুচ্ছ হয়ে গেল। কারণ মাঠে নেমে ওরা দেখিয়ে দিল, সাহসের কোনো উচ্চতা মাপা যায় না, স্বপ্নের কোনো গড়ন থাকে না।
এই মেয়েরা প্রত্যেকেই দারিদ্র্যতার ভেতর দিয়ে বড় হয়েছে। যাদের পরিবার প্রতিদিন জীবনযুদ্ধে লড়েছে, সীমাবদ্ধতার দেয়াল ভেঙে যাদের সামনে এগোতে হয়েছে। সেই জায়গা থেকে উঠে এসে অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে, এত বড় এক আসরে খেলা—ভাবা যায়? এই পথচলায় শুধু প্রতিভা নয়, লাগে অসীম ধৈর্য, আত্মত্যাগ আর এক অদম্য মনোবল। আজ মাঠে দাঁড়িয়ে আমি বারবার অনুভব করেছি—এরা শুধু ফুটবলার নয়, এরা সংগ্রামের প্রতীক।
খেলার প্রথমার্ধে প্রায় ত্রিশ মিনিট ধরে চীন আমাদের গোলে বল ঢোকাতে পারেনি। বিশ্ব ফুটবলে যারা বহুদূর এগিয়ে, যাদের পাসিং, ফিজিক্যাল স্ট্রেংথ আর অভিজ্ঞতা প্রশ্নাতীত—তাদের সামনে আমাদের মেয়েরা বুক চিতিয়ে দাঁড়াল। আমি বিস্মিত হয়ে দেখছিলাম, কীভাবে সংগঠিত ডিফেন্সে ওরা বারবার আক্রমণ ঠেকাচ্ছে। বিশেষ করে রিতুপর্ণার ডি-বক্সের অনেক বাইরে থেকে নেওয়া শট—সে শট ছিল সাহসের ভাষ্য, আত্মবিশ্বাসের ঘোষণা। গোল না হলেও, সেই মুহূর্তে মনে হয়েছে: আমরা ভয় পাচ্ছি না।
হ্যাঁ, শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ দুই গোল খেয়েছে। স্কোরলাইনটা হয়তো ইতিহাসের পাতায় সাদামাটা থাকবে। কিন্তু ফুটবল তো শুধু গোলের হিসাব নয়—এ এক মানসিক যুদ্ধ। আর সেই যুদ্ধে আমাদের মেয়েরা হারেনি। কারণ China বিশ্ব র্যাংকিংয়ে অনেক এগিয়ে থাকা দল। তাদের বিপক্ষে এভাবে দাঁড়িয়ে লড়াই করাই এক বিশাল অর্জন। এই ম্যাচ আমাদের শিখিয়েছে—সঠিক প্রস্তুতি, সুযোগ আর বিশ্বাস পেলে আমরা কারও চেয়ে কম নই।
স্টেডিয়ামে বসে বারবার মনে হচ্ছিল, এরা আমাদের অর্জন। এরা মেয়েদের অর্জন। এরা সেইসব মেয়েদের প্রতিনিধি, যারা সমাজের নানা বাধা, দারিদ্র্য আর অবহেলার দেয়াল ভেঙে সামনে আসতে চায়। আজ যারা মাঠে ছিল, তারা হয়তো জানেও না—দেশের কত কিশোরী আজ টিভির সামনে বসে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। ভাবছে, আমিও পারি। আমিও একদিন দেশের জার্সি গায়ে মাঠে নামতে পারি।
এই হার আমাদের মাথা নিচু করেনি; বরং পথ দেখিয়েছে। দেখিয়েছে কোথায় আমরা শক্ত, কোথায় আরও পরিশ্রম দরকার। সবচেয়ে বড় কথা, আজ আমরা দেখেছি আত্মবিশ্বাসের এক নতুন বাংলাদেশ—যে বাংলাদেশ ভয় পায় না বড় নামের সামনে দাঁড়াতে। এই মেয়েরা যদি এভাবেই এগিয়ে যায়, তবে জয় আসবেই—শুধু ম্যাচে নয়, ইতিহাসেও।
আজ তাই মন খারাপ নয়। আজ বুক ভরা গর্ব। কারণ আমি জানি, এই লড়াই থামবে না। এই সাহস একদিন আমাদের অনেক দূরে নিয়ে যাবে। সাবাশ বাংলাদেশ, সাবাশ বাঘিনীরা।
আরিফুর রহমান
ঔপন্যাসিক, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক- প্রশান্তিকা
সিডনি।