গানের স্রোতে পাল তুলেছে হাজার প্রজাপতি । অজয় দাশগুপ্ত
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে সিডনিতে প্রভাতফেরী ও বিগবি আয়োজন করেছে বিশেষ অনুষ্ঠান ‘ধুন ২০২৬’। এই আয়োজনের প্রধান আকর্ষণ বরেণ্য শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা।
এই ছিল তাঁর আগমনের খবর। অনেকদিন পর, বিশেষত বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন আর নানা ধরনের ওঠানামার পর এমন একটা আয়োজনের প্রয়োজন ছিল। রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন, “বুক বেঁধে তুই দাঁড়া দেখি, বারে বারে করিস নে ভয়…” বুকে বুক বেঁধা বাঙালি দাঁড়াতে জানে। কিন্তু তার একটা ঢাল তো চাই। বড় বড় সব বাঙালিদের আমরা মোটামুটি অপমান করে ফেলেছি। কাউকে কাউকে ধুয়ে-মুছে সাফ করেও শান্তি পাইনি। এই মানুষগুলো বারংবার বুদবুদের মতো ভেসে ওঠেন, কিন্তু মিলিয়ে যান না। এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে বাঙালি হতে গেলে গানের কোনো বিকল্প নাই। তাই এই খবরটি দেখার পরপরই আনন্দে মজেছিলাম। আয়োজক প্রভাতফেরীর দেওয়ান ভাই আর শ্রাবন্তী কাজী কাছের মানুষ। বিগবির বাসব বাবুও অচেনা নন। পরে বন্যার সঙ্গে দেখাও-পরিচিত হওয়ার আরেকটা আমন্ত্রণ জানিয়েছিল অর্নব। সেও আমার প্রীতিভাজন। সে অনুষ্ঠানে শরীর খারাপের জন্য যাওয়া হয়নি।
মূল যে গানের অনুষ্ঠান, সেটিও অধরা থেকে গিয়েছিল। এরপর আবার তাঁর সঙ্গে দেখাও, কর্মশালায় যোগ দেওয়ার সুযোগ এসেছিল। প্রতীতি’র কর্ণধার সিরাজুস সালেকিন নিজেই একজন রবীন্দ্রপ্রেমী মানুষ। তাঁর এই আয়োজন চমৎকার হওয়ারই কথা। না, সেটাতেও যাওয়া হলো না। তখন প্রায় ধরে নিয়েছিলাম, এবার আর তাঁর গান শোনা হবে না। কথাও হবে না।
দীপা জানালো, আত্মীয়তুল্য স্নেহের মানুষ চিকিৎসক পার্থ বোস আর তাঁর স্ত্রী মৌমিতা আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে রেখেছেন তাঁদের বাড়িতে। সেখানেও গান গাইবেন রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। বিকেল বিকেল তাঁদের ঢাউস সাইজের অসাধারণ নতুন বাড়িতে পৌঁছে দেখি সাজ সাজ রব। সবাই হাত লাগিয়েছে নানা কাজে। ছোটখাটো মঞ্চ তৈরি হয়ে গেছে বাড়ির এক ঘরে। চেয়ার পাতা, ফুল, খাবার, মাইক্রোফোন—কিছুই বাদ ছিল না। সেখানে গিয়ে পেলাম সুবীর গুহকে। সুবীর এখন পার্থে বসবাস করে। অসামান্য এক তবলা বাদক সুবীর পাঁচ ঘণ্টা উড়াল দিয়ে সিডনি এসেছিল বন্যার সঙ্গে বাজাবে বলে। আরও দেখা হলো রিপন বড়ুয়ার সঙ্গে।
সেদিন সন্ধ্যা সাতটায় শুরু করে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত একনাগাড়ে গান করেছিলেন তিনি। বয়সের একটা ছাপ যেমন থাকে, তেমনি মাধুর্যও থাকে বৈকি। কিছু কিছু গানে আমার মনে হয়েছে, পরিণত মাধুর্য গানগুলোকে আরও চমৎকার করে তুলেছিল। আমি সারাদিনই রবীন্দ্রনাথের গান শুনি। তাঁর গান গুনগুন করতে থাকি। এতবার, এতভাবে শোনার পরও সেদিন বন্যা যখন “ঝরা পাতা গো, ঝরা পাতা গো, আমি তোমারই দলে” গাইছিলেন, বহুবার আমার চোখ ছলছল করে উঠেছিল। ঝরে যাওয়া একটি পাতা যে কেবল পাতা নয়, সে যে মানুষের আশা, স্বপ্ন, এমনকি জীবন হতে পারে—সে ভাবটাই ফুটে উঠেছিল শুদ্ধ গায়কীতে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজের লেখা গানের বিষয়ে বলেছিলেন, “আমার গান তোমাদের গাইতেই হবে।” দেড়শ বছর পেরিয়ে গেল তাঁর জন্মের। লোকান্তরিত হয়েছেন, তা-ও হয়ে গেল অনেক বছর। তাঁর গান বাঙালিসহ উপমহাদেশের মানুষের নিত্যদিনের জীবনচর্চায় মিশে আছে গভীরভাবে। মঞ্চ, ছোট পর্দা, বড় পর্দাকে প্রভাবিত করেছে নানাভাবে, নানা সময়ে।
সেদিন বন্যা শুরু করেছিলেন “আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে” দিয়ে। মনে হচ্ছিল, এক নিমিষে মনে মনে ছড়িয়ে গিয়েছিল সুরের আগুন, যার পরশমণিতে ধন্য হয়ে উঠেছিল পরিবেশ। এরপরই গাইলেন বাংলাদেশের মানুষের আবেগ আর ভালোবাসার গান—“ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকাই মাথা”। কারও অনেক বছর, কারও কারও দীর্ঘ সময় ধরে স্বদেশে, মাতৃভূমিতে মাথা নোয়াতে না পারার বেদনা ছড়িয়ে গিয়েছিল মুহূর্তে।
আমার মনে হয়েছে, তুলনাহীন এই পরিবেশ তৈরি করতে যতটা গায়কি, কণ্ঠসুধা আর পরিণত হৃদয় থাকা দরকার, ততটাই দিতে পেরেছিলেন তিনি।
মানুষের চাওয়ার গান গেয়েছেন। নিজের পছন্দের গান শোনাতে গিয়ে “আমার বিচার তুমি করো তবে আপন করে…” এই গানটিতে কথা এমন—
লোভে যদি কারে দিয়ে থাকি দুখ,
ভয়ে হয়ে থাকি ধর্মবিমুখ,
পরের পীড়ায় পেয়ে থাকি সুখ ক্ষণেক-তরে—
তুমি যে জীবন দিয়েছ আমায়,
কলঙ্ক যদি দিয়ে থাকি তায়,
আপনি বিনাশ করি আপনায় মোহের ভরে,
আমার বিচার তুমি করো তব আপন করে॥
কেদারা রাগের তেওড়া তালের এই গানটি আমাকে অনেক কিছু ভাবতে বাধ্য করেছে সেদিন। এ যেন আত্ম-উন্মোচনের এক দলিল। আত্মবিশ্লেষণ আর নিজের প্রতি এমন নির্মম হওয়ার সাধ্য বা ক্ষমতা সবার থাকে না। রবীন্দ্রনাথের ছিল বলেই তিনি আজও নন্দিত। এই গান কি বন্যা তাঁর মনের দরজা খুলে দিতে গেয়েছিলেন? তা জানি না। তবে এটা জানি, আমরা এমন এক জাতি, যারা রবীন্দ্রনাথকেও ছাড় দিতে চাই না। আজকাল খুব সহজ শিকার রবি ঠাকুর। কত কারণে, কত অজুহাতে যে তাঁকে অপমান করা হয়, সেটা ভাবাও আমার জন্য পাপ।
এই যে বন্যা এলেন, গাইলেন, ক’দিন ধরে সিডনির বাঙালির সাংস্কৃতিক জগত শুদ্ধ করে দিয়ে গেলেন—সেটাও কি খুব মসৃণ কিছু ছিল? যারা গান শুনতে গেছেন, নানা অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে ছবি তুলে ধন্য হয়েছেন, তারাও ছাড় দেননি। দেশের রাজনীতি, দেশের পালাবদলের দায় একজন গুণী শিল্পীর কাঁধে তুলে দিতে কী নির্মম আনন্দ! যেন তিনি চাইলেই সবকিছু পাল্টে দিতে পারতেন, বা চাইলেই পারেন দেশের যাবতীয় জঞ্জাল সরিয়ে দিতে। সবাই জানেন, এটা তাঁর কাজ নয়, তিনি তা করতে পারবেন না। তবু এই যে কারও ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া—এতেই আনন্দ আমাদের।
এসব কথা থাক। বন্যা আমাদের এই বাঙালি জগতকে যে আনন্দ আর মাধুর্য দিয়ে গেছেন, তার রেশ থাকবে অনেক দিন। খুব ছোট ছোট কথা আর সাধারণ গানের বাণীতে রবীন্দ্রনাথ কত বড় বড় কথা লিখে গেছেন, ভাবতেই বিস্ময় জাগে। এমন একটা গানের কথা—
“আলোর স্রোতে পাল তুলেছে হাজার প্রজাপতি
আলোর ঢেউয়ে উঠলো নেচে মল্লিকা মালতি….”
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার রবীন্দ্রসন্ধ্যায় হাজার প্রজাপতি ডানা মেলেছিল, বাইরে আলো-অন্ধকারে নেচে উঠেছিল মল্লিকা মালতি। আমাদের দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার স্বাধীনতা পুরস্কার এবং ভারতের পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত এই শিল্পীর গানে এমন হবে—এটাই তো স্বাভাবিক। আরেকটা কথা বলতেই হবে, বিনয়, আত্মমর্যাদা আর পুরস্কারের সম্মান কীভাবে ধরে রাখতে হয়, সেটাও তাঁকে দেখে শেখা সম্ভব।
দীর্ঘায়ু হন আপনি। আপনার গানের ধারা ছড়িয়ে পড়ুক আরও উদার গগণে, আরও নিবিড় নীলিমায়।




