রুপন্তী: প্রাশান্ত পারের মেয়ে, বনলতা সেন-এর মুখচ্ছবি 

রুপন্তী: প্রাশান্ত পারের মেয়ে, বনলতা সেন-এর মুখচ্ছবি 

আতিকুর রহমান শুভ: এবার ঈদে মুক্তি পেয়েছে দুটি ভীষণ ভালো চলচ্চিত্র- রইদ এবং বনলতা সেন। দুটি ছবির ট্রেলার ও গান ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের বাইরে অজস্র বাংলা ভাষাভাষী দর্শকের হৃদয়ে সাড়া ফেলেছে। 


গুণী নির্মাতা মাসুদ হাসান উজ্জ্বল পরিচালিত বনলতা সেন চলচ্চিত্রে একটি মুখ্য ভূমিকায় রয়েছেন সিডনিবাসী জনপ্রিয় অভিনেত্রী রুপন্তী আকিদ। ঈদের দিন থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে একটানা চলছে ছবিটি। দর্শকেরা ছবিটির নির্মাণশৈলী এবং অভিনেতাদের অভিনয়ের প্রশংসায় বিভোর। প্রশংসায় ভাসছেন শোভনা চরিত্রে অভিনয় করা রুপন্তীও। ঢাকার সিনেমা হলগুলোতে, বিভিন্ন বিলবোর্ডে অন্যান্য অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সঙ্গে রুপন্তীর ছবিও দেখা যাচ্ছে।

দর্শক ছাড়াও বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে রুপন্তীকে প্রশংসা করে বিশেষ প্রতিবেদন। বাংলাদেশের প্রখ্যাত সংবাদমাধ্যম ‘দৈনিক বণিক বার্তা’ একটি শিরোনাম করেছে- “বলিউডের পরে ঢালিউডে রুপন্তী আকিদ…”। বিভিন্ন সিনেমা হলে দর্শকেরা ছবি দেখে বের হওয়ার সময় প্রতিক্রিয়ায় রুপন্তীর অভিনয় প্রতিভার প্রশংসা করছেন। গতকাল বিজয় টিভির একটি রিঅ্যাকশনে এক ভদ্রলোক বললেন, “অভিনয় খুব ভালো ছিল, বিশেষ করে শোভনা চরিত্রে রুপন্তীর অভিনয় ছিল দারুণ।”

রুপন্তীকে আমরা দেখেছি মাহফুজ আহমেদের সেই বিখ্যাত ভিজ্যুয়াল ‘হ্যালো বাংলাদেশ’ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক মুক্তিপ্রাপ্ত বলিউড ও অস্ট্রেলিয়ার যৌথ প্রযোজনায় আলী সায়িদের হিন্দি ছবি ‘হিন্দি ভিন্দি’সহ  অসংখ্য নাটক, টেলিফিল্ম ও চলচ্চিত্রে। কিন্তু বনলতা সেন ছবিতে তাঁর অভিনয় তাঁকে একটি সিগনেচার ব্র্যান্ডে রূপান্তরিত করবে- নিঃসন্দেহে। এ যেন প্রশান্ত পার থেকে নাটোরের সেনবাড়ি জয় করারই প্রেক্ষাপট তৈরি করল আমাদের রুপন্তী।

প্রশান্তিকার সঙ্গে কথোপকথনে রুপন্তীর সেই উচ্ছ্বাসই ধরা পড়ল। তিনি জানালেন, দেশ থেকে অসংখ্য দর্শক ছবিটি দেখে তাঁকে অভিনন্দিত করছেন। “২০২৩ সালে শুটিং হওয়া ছবিটি অবশেষে মুক্তি পেয়েছে। দর্শকেরা হলে গিয়ে বড় পর্দায় ছবিটি দেখছেন- এই আনন্দের সঙ্গে আর কী-ই বা তুলনা চলে!” বনলতা সেন ছবিতে রুপন্তীর চরিত্র সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, “আমার চরিত্রের নাম শোভনা দাশ— জীবনানন্দ দাশের সম্পর্কে কাজিন। শোভনাই ছিলেন তাঁর জীবনের সত্যিকারের প্রেম, প্রথম প্রেম। 

 

রুপন্তী বলেন, “জীবনানন্দ দাশ আমার মায়ের দেশের কবি। এই ছবিতে কাজ করতে গিয়ে কবি সম্পর্কে অনেক কিছু নতুন করে জানা হয়েছে। আসলে এটা আমাকে ভীষণভাবে সাহায্য করেছে, কারণ আমি একদম খোলা আর নির্মল মন নিয়ে পরিচালকের দৃষ্টিভঙ্গিটা বুঝতে পেরেছি, কোনো ধরনের পূর্বধারণা ছাড়াই। সিনেমাটার জন্যই মূলত গবেষণা শুরু করি। যেহেতু আমার পুরো পড়াশোনা সিডনিতে, তাই ছবির আগে আমি মূলত ইংরেজি ভাষার কবিদের সঙ্গেই বেশি পরিচিত ছিলাম।”

শুটিং কিংবা ছবি নির্মাণের কোন মুহূর্তটা বেশি করে মনে পড়ে— এই প্রশ্নের জবাবে রুপন্তী বলেন, “প্রতিটি মুহূর্তই ভীষণ সুন্দর ছিল। আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ যে এতটা কাব্যিক আর সিনেমাটিক একটি ছবির সঙ্গে আমি আজীবনের জন্য জড়িয়ে থাকব। আমার বিশ্বাস, অস্ট্রেলিয়ার দর্শক এই ছবি দেখার পর আমাদের বাংলাদেশি চলচ্চিত্রকে একদম নতুন দৃষ্টিতে দেখবে।”

রুপন্তী বলেন, “প্রমিত বাংলা উচ্চারণ শেখা থেকে শুরু করে সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র দেখা পর্যন্ত পুরো যাত্রাটা যেন এক অসাধারণ পাঠশালা ছিল। যারা ইতোমধ্যেই ছবিটা দেখেছেন, তাদের কাছ থেকে অনেক ভালোবাসা আর প্রশংসা পেয়েছি। অনেকেই বলেছেন, দেখে মনেই হয়নি আমি এখানে জন্মে বড় হয়েছি। এই প্রশংসাটা আমার জন্য ভীষণ অর্থবহ, কারণ এই চরিত্রটার জন্য আমি অনেক সময় আর পরিশ্রম দিয়েছি। বাকিটা বড় পর্দায় দেখবেন। আমি আশা করি, এই ছবির প্রতিটি চরিত্রের সঙ্গে দর্শক কোনো না কোনোভাবে নিজেদের মিল খুঁজে পাবেন। আমার বিশ্বাস, এই চলচ্চিত্র একদিন কালজয়ী ক্লাসিক হয়ে উঠবে। আর সবার প্রতিক্রিয়া শোনার জন্য আমি ভীষণ রোমাঞ্চিত।”

 

লেখক ও শিল্পসমালোচক শাখাওয়াৎ হোসেন লিখেছেন- “আর মুগ্ধ করেছেন শোভনা। জীবনানন্দের আশপাশে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছেন শোভনা। শোভনা চরিত্রে অভিনয় করেছেন রুপন্তী আকিদ। একটা ইন্টারভিউ দেখে তার বাংলা উচ্চারণ নিয়ে রীতিমতো আশঙ্কায় ছিলাম। ওই আশঙ্কা কেটে গেছে সিনেমা দেখার পর। গলার স্বর ভীষণ মিষ্টি তার। ছোট্ট ছোট্ট শব্দে সংলাপ ডেলিভারি, আর তার সঙ্গে জীবনানন্দের জীবনের বোধহয় একমাত্র সুখী সময়টা উপভোগ করেছি খুব।”

ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ঢাকায় ছবিটির প্রিমিয়ারে রুপন্তী যেতে পারেননি। সিডনিতে তিনি মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায় মডেলিং ও অভিনয়ের পাশাপাশি নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্য সরকারের একটি দায়িত্বপূর্ণ পদে কর্মরত আছেন।

পরিচালক মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের দ্বিতীয় সিনেমা বনলতা সেন। আরেক গুণী নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমন ও উজ্জ্বল দু’জনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটে পড়াশুনা করেছেন। মেঘদল নামে একটি ব‍্যান্ডেরও সদস‍্য ছিলেন তারা। সুমনের ‘রইদ’ এবং উজ্জ্বলের ‘বনলতা সেন’ একই সঙ্গে একই ঈদে মুক্তি পেয়েছে এবার। 

 

২০২৩ সালে মাসুদ হাসান উজ্জ্বল বনলতা সেন-এর শুটিং শেষ করেন। ৫ আগস্টের পর উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘদিন পোস্ট-প্রোডাকশনের কাজ শেষ করতে পারেননি। অবশেষে ভারতে সেটির কাজ শেষ করে এই ঈদে মুক্তি দিতে পেরেছেন।

বনলতা সেন শুধু কবিতার মতো কিংবা কবিতা থেকে নির্মিত কোনো চলচ্চিত্র নয়; এটি জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে প্রায় আড়াই ঘণ্টার একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। ছবিটির ট্রেলার দেখলেই মন ভরে যায়। কী সুন্দরভাবে জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে গবেষণার মধ্য দিয়ে ছবিটি এগিয়ে গেছে!

জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামান যখন তাঁর উপন্যাস একজন কমলালেবু লিখছিলেন, তখন তিনি কলকাতায় গিয়ে কবির পুরোনো বাড়ির জানালার লোহার গ্রিল ধরে যেন জীবনানন্দের স্পর্শ অনুভব করতে চেয়েছিলেন। এই চলচ্চিত্রের নির্মাণেও সেই গবেষণার ছাপ স্পষ্ট। এমন আবহ আমরা ওপার বাংলার গুণী পরিচালক সৃজিত মুখার্জির ‘লহ গৌরাঙ্গের নাম রে’ ছবিতেও দেখেছি। অবশ্য তারও অনেক আগে মাসুদ হাসান উজ্জ্বল তাঁর বনলতা সেন–এর শুটিং শেষ করেছিলেন।

লেখক ও প্রকাশক মাজহারুল ইসলাম বনলতা সেন দেখে বলেছেন- “চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে বড় সাফল্য এর আবহ নির্মাণে। ধীরগতির দৃশ্যবিন্যাস, নরম আলো, সংলাপে পরিমিতিবোধ এবং নীরবতার ব্যবহার সিনেমাটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। পরিচালক মাসুদ হাসান উজ্জ্বল দৃশ্যের ভেতর অতিরিক্ত নাটকীয়তা আনেননি; বরং তিনি এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছেন, যেখানে মানুষের ভেতরের নিঃসঙ্গতাই প্রধান চরিত্র হয়ে ওঠে। জীবনানন্দ দাশের কবিতার যে বিষণ্ন অথচ মোহনীয় জগৎ, সেটির প্রতিফলন চলচ্চিত্রের প্রতিটি ফ্রেমে পাওয়া যায়।”


“এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর”— এই লাইনটি যে চলচ্চিত্রে আছে, সেটি অবশ্যই কালোত্তীর্ণ হবে। সেই কালজয়ী ছবিতে খায়রুল বাশার, নাবিলা, সোহেল মণ্ডলদের সঙ্গে প্রশান্ত পারের বাঙালি দ্যুতি রুপন্তীর সম্পৃক্ততায় আমরাও গর্ববোধ করি। অপেক্ষায় রয়েছি কবে সিনেমাটি সিডনিসহ অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন সিনেমাহলে মুক্তি পাবে, সেই দিনের।