হাজারমুখী মা- হাজারমুখী রোদসী । পাঠ প্রতিক্রিয়া । আতিকুর রহমান শুভ
২০২৫ সালে আমার সর্বশেষ পড়া বইটির নাম হাজারমুখী রোদসী। লিখেছেন কাজী লাবণ্য। তিনি অস্ট্রেলিয়ায় তাঁর মেয়ের বাড়িতে ঘুরতে এসে পার্থের দ্য সিটি অব জুন্ডালাপের একটি বিচে বেড়াতে গিয়ে এই উপন্যাসের ভাবনায় আচ্ছন্ন হন। তাঁর নিজের ভাষায়—সেই বিচের সীমাহীন সৌন্দর্য আর মর্মছোঁয়া মৌনতায় সৃষ্টি হয়েছে এই আখ্যান।
আমাদের অঞ্চলে কিংবা আমাদের আত্মীয়স্বজনদের কেউ মারা গেলে সবার আগে ডাক পড়ে আমার মায়ের। আমার মা প্রয়াত মানুষটির শিয়রে বসে কোরআন পড়েন, পাঞ্জেগানা, ওয়াজিফা থেকে দোয়া-দরুদ পড়েন, আর থাকে মৃত ব্যক্তির জন্য চোখের জল। এমনকি এই বৃদ্ধ বয়সেও মাকে যেতে হয়। সেই পরিবার মাকে পেলে যেন মনে করেন, মৃতের আত্মা পরকালে বেহেশতে যাবেন। আমি একবার মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম—মা, কী দোয়া পড়েন? মা বলেছেন—সুরা ইয়াসিন, সুরা মুলক, আরও অনেক দোয়া। গ্রামে মা যখনই যান, তাঁর ব্যাগভর্তি থাকে ফ্লাজিল, প্যারাসিটামল, কৃমি, পাতলা পায়খানা, আমায়শার ওষুধ আরও কত কী! নিশ্চিত আমার মা একজন হাজারমুখী?
হুমায়ূন আহমেদের একটি আত্মজীবনীতে আরেকটি পেশার পরিচয় পেয়েছিলাম। তিনি বলেছেন-ময়মনসিংহের নেত্রকোনায় এক ধরনের পেশাজীবী রয়েছে, যাদের নাম ‘কিছক’। এর মানে হলো ভাঁড়। সেখানে বিচার-শালিসে তাদের ভাড়া করে আনা হয়। তাদেরকে আলাপী বলেও ডাকা হয়। নানা হাস্যরসে তারা সমস্যার সমাধান করেন।
সিরাজগঞ্জে আমার গ্রামে আমার গ্রামসরকার দাদার কোলে বসে অনেক বিচার-শালিস নামাতে দেখেছি। দাদা কখনোই মকবুল মণ্ডল ছাড়া এই কাজ করতেন না। তিনি নানা রকম গল্পের মাধ্যমে বাদী ও বিবাদী উভয়ের মন শান্ত করতেন। অবশেষে দাদা চমৎকার একটি রায় দিয়ে বিচারকার্য শেষ করতেন। দাদার নামানো বিচার আরেকবারের জন্য কখনই বসাতে হয়নি।
আমাদের জীবনের স্বাভাবিক কাজকর্ম ছাড়াও পৃথিবীতে রয়েছে হাজার রকম পেশার মানুষ। অনেকেই আবার একই সঙ্গে অনেক রকম পেশায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। এই কারণে তাদেরকে হাজারমুখী বলে। আমরা এমনই এক হাজারমুখীর সন্ধান পেলাম কাজী লাবণ্যের ছোট্ট একটি উপন্যাস পড়ে।
লাবণ্যের হাজারমুখী মা একজন বিধবা। তাঁর রয়েছে একটি সন্তান। নিজের উপার্জনে মাদ্রাসায় ছেলের পড়াশোনার খরচ, নিজের খরচ চলে। মাঠে কৃষিকাজের পরেও তাঁকে নানাবিধ কাজ করতে হয়। তাঁর বিশেষ একটি কাজ হলো মৃতবাড়িতে কান্না করার কাজ। অর্থাৎ এলাকায় কেউ মরলে সেই বাড়িতে কান্না করার জন্য তাঁর ডাক পড়ে; সঙ্গে রয়েছে আনুষঙ্গিক আরও কাজ। আবার কোনো বিয়ে বাড়িতেও গীত গাওয়ার জন্য তাঁর ডাক পড়ে। সেজন্যই তাঁর নাম হয়েছে হাজারমুখী।
লাবণ্য লিখেছেন—
‘মুখে একটা খিলি পুরে হাজারমুখী গীত শুরু করে—
লাল ময়না তোরে কারণে রে,
সোন্দর ময়না তোরে কারণে রে,
খোলাহাটির বালুচরে শায়মনা টাঙাইছে রে,
লাল ময়না তোরে কারণে রে,
সোন্দর ময়না তোরে কারণেরে…’
নিজের ছেলের বউয়ের জন্যও তার আকুলবিকুলি।
‘বিয়ের জন্য, বউয়ের জন্য সে পয়সা জমাতে থাকে। বউ আসলে ব্যাটা কামাই না করি কেমন করি থাকপে, তখন ঠিকই কামাই করবে—এমনটাই মায়ের ভাবনা।’
অভাবের সংসারে তাঁর নিত্যদিনের বেঁচে থাকাটাই একটি সংগ্রাম। লাবণ্য লিখেছেন—
‘অবহেলা, অভাব, বঞ্চনায় বুকের ভেতর এসব মেলা, বান্নি, হালখাতা—এমনকি আস্ত চিকলি নদীটাই কখন শুকিয়ে গেছে, ময়না টেরও পায়নি।’ অভাব প্রকট হয় যখন আমরা আরও পড়ি- ‘ফেরেশতা কোথায় থাকে? আসমানে থাকে? ফেরেশতা এই জমিনেই থাকে।’
কিংবা—
‘জীবন নদীর একদিকের চরে আরও চর পড়ে চরচর করে, মরুভূমি আরও ধুধু করে, আবার অন্যদিকে কোথাও না কোথাও শিশির জমে জমে দীঘি হয়।’
মাদ্রাসা বোর্ডিংয়ে থেকে ছেলের পড়াশোনা, তাকে এবং আরও অসংখ্য কোমলমতি ছাত্রকে ঘিরে বড় হুজুরের যতসব বদ মতলব—অবশেষে কী সাংঘাতিক, নির্মম পরিণতি, সবই উঠে এসেছে এই আখ্যানে। মাত্র ৯০ পৃষ্ঠার এই আখ্যানে কয়েকটি পুরো জীবন যেন ধরা থাকল।
লেখকের নিজের ভাষায়—
ষাট-সত্তর বছর পূর্বের গজেন্দ্রকুমার মিত্রের শ্যামা আর আজকের হাজারমুখীর চাক্ষুষ কোনো বন্ধন না থাকলেও তারা পরস্পরের আত্মীয়। হাজারমুখী শ্যামা ঠাকরুনেরই উত্তরসূরি।
বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের চলিত ভাষা, ভুলে যাওয়া গীত-গান, মেলা-পার্বণ আর নানামুখী পেশার জীবনের জয়গান রয়েছে এই উপন্যাসে। গত বছরে আমার পড়া সবচেয়ে সেরা উপন্যাস—কাজী লাবণ্যের হাজারমুখী।
হাজারমুখী রোদসী- কাজী লাবণ্য
প্রকাশক: গ্রন্থিক প্রকাশন
প্রচ্ছদ: তাইফ আদনান
অস্ট্রেলিয়ায় প্রাপ্তিস্থান: প্রশান্তিকা বইঘর
আতিকুর রহমান শুভ : সম্পাদক, প্রশান্তিকা




